মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পে পাথর উত্তোলন বাড়লেও বিক্রি কম!

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫৯

দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পে পাথর উত্তোলন বাড়লেও বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে কোম্পানিটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে খনি এলাকায় ১৩৫ কোটি টাকার ৬ লাখ মেট্রিক টনের অধিক পাথর মজুত রয়েছে। খনি কর্তৃপক্ষের বাস্তবসম্মত বিপণন ব্যবস্থা না থাকা ও পাথর পরিবহনে মোটরযানের এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ আরোপ হওয়ায় পাথর বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) মো. আবু তালেব ফারাজী জানিয়েছেন, খনিতে পাথর উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে খনি থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন করে পাথর উত্তোলন করে। ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করা হয়।

পাথর বিক্রির কাজটি তদারক করে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি। তারা শূন্য থেকে ৫ মিলি ডাস্ট পাথর ৯শ টাকা, ৫ মিলি থেকে ২০ মিলি পাথর ৩ হাজার টাকা, ২০ মিলি থেকে ৪০ মিলি পাথর ২ হাজার ৮শ টাকা, ৪০ মিলি থেকে ৬০ মিলি পাথর ২ হাজার ৭৪৬ টাকা, ৬০ মিলি থেকে ৮০ মিলি পাথর ২ হাজার ৪৯৫ টাকা এবং বোল্ডার পাথর ২ হাজার ৬শ টাকা প্রতি মেট্রিক টন দর নির্ধারণ করে বিক্রি করছে।

কিন্তু ২০১৮ সালের মার্চে সরকার মোটরযান এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধি জারি করার পর থেকে পাথর বিক্রি কমে গেছে। ইতিপূর্বে ১০ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ৪২ থেকে ৪৬ মেট্রিক টন ও ৬ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ৩০ থেকে ৩২ মেট্রিক টন পাথর পরিবহন করলেও বর্তমান বিধি অনুযায়ী ১০ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ৩২ মেট্রিক টন ও ৬ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ২২ মেট্রিক টনের বেশি পাথর লোড করতে পারছে না। ফলে লোকসান দেখা দেওয়ায় পাথর ডিলাররা আগের মতো আর পাথর কিনছে না। তবে ডিলারদের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে পাথর সরবরাহ  করা হচ্ছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্রিজ, রিয়েল এস্টেট, রেল লাইন, বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কাজে পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর ও দিনাজপুর থেকে গোবিন্দগঞ্জ চার লেন সড়কের কাজ শুরু হলে দুই মাসের মধ্যেই মজুত পাথর শেষ হয়ে যাবে।

খনির একটি সূত্র জানিয়েছে, খনি কর্তৃপক্ষের বাস্তবসম্মত বিপণন ব্যবস্থা না থাকায় পাথর বিক্রিতে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিক্রয়নীতি বাজার উপযোগী না হওয়ায় প্রতি মাসে ১০ কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপাড়া পাথর খনি কর্তৃপক্ষের অদক্ষ বিপণন ব্যবস্থার কারণে পাথর খনির ৯টি ইয়ার্ডে প্রায় ৭ লাখ টন পাথর অবিক্রীত থাকার দরুন পাথর খনিটির উত্পাদন বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে অবিক্রীত পাথরের স্তূপ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। এরকম চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যেই পাথর খনিটি আবারো বন্ধের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। এ অবস্থায় খনির উপর নির্ভরশীল শ্রমিক ও খনি সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর জীবন ও জীবিকা নির্বাহে অপূরণীয় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ব্যাপারে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিঃ-এর ডিলার মো. মমিনুল হক মমিন জানান, পাথর বিক্রি না হওয়ার মূল কারণ হলো এখানো শুধু কমিশন দেওয়া হয়। আমরা এর পূর্বে কমিশন পেতাম ৫ শতাংশ। কর্তৃপক্ষ এখন আমাদের কমিশন কেটে ৩ শতাংশ দিচ্ছে। ৩ শতাংশের উপর আবার আমাদের ভ্যাট কাটছে ১৫ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে লাভ কমে যাওয়ায় পাথর বিক্রিতে আমাদের আগ্রহ কমে গেছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ভারত, ভুটানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাথর আমদানি করছে। কারণ সেখান থেকে আনা পাথরের মূল্য মধ্যপাড়ার তুলনায় কম পড়ছে। এছাড়াও রয়েছে পরিবহনের সমস্যা। আগে একটা ১০ চাকার গাড়িতে আমরা ৪১ থেকে ৪৫ মেট্রিক টন পাথর লোড করতাম। সেটাকে এখন কর্তৃপক্ষ ধার্য করছে ৩০ মেট্রিক টন। আগে যা ভাড়া ছিল এখন পাথর কম লোড হওয়ার পরও পরিবহন ভাড়া দ্বিগুণ দিতে হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক লোকসানের কারণে খনি থেকে পাথর সংগ্রহ করছে না।

দুদু এন্ড ব্রাদার্সের পরিবেশক মাসুদার রহমান জানিয়েছেন, মধ্যপাড়া পাথর খনিতে গ্রাহকরা চাহিদা অনুযায়ী পাথরের সাইজ পাচ্ছে না। হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানিকৃত পাথর সাইজ অনুযায়ী পাওয়া যায়। ফলে গ্রাহকরা হিলি থেকেই পাথর কিনছে। এছাড়াও প্রতি ট্রাকে খনি কর্তৃপক্ষ যে পরিমাণ পাথর লোড করতে দিচ্ছে তা দিয়েও ব্যবসায়ীরা ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারছে না। অথচ হিলি পোর্টে প্রায় দ্বিগুণ পাথর লোড হচ্ছে। ফলে পাথর ব্যবসায়ীরা মধ্যপাড়া খনি থেকে পাথর না কিনে হিলি স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাথর কিনছে। এ কারণেই মধ্যপাড়া খনিতে পাথর বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে।

মধ্যপাড়া লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাদেকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইতিপূর্বে এই খনিতে প্রতিদিন ২শ থেকে ২৫০ ট্রাক পাথর লোড হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেত। পাথর বিক্রি কমে যাওয়ায় বর্তমানে মাত্র ২০ থেকে ৩০ ট্রাক পাথর প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, এই খনিতে পাথর লোডিংয়ে প্রায় ২৫০ থেকে ২৮০ জন শ্রমিক কর্মরত আছেন। কাজ কমে যাওয়ায় তারা বর্তমানে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। খনি কর্তৃপক্ষ সরকারের সাথে আলোচনা করে পাথর বিক্রি করতে না পারলে সবদিকে বিপর্যয় আসবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।