রাজধানীর উত্তরখানের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র কামরুল হাসান হূদয়কে ক্রমেই বিপজ্জনক হইয়া উঠা কথিত ‘কিশোর গ্যাং’-এর হিংস্রতার সর্বশেষ শিকার হয়ত বলা যাইবে না। কারণ ইহার শুরু রাজধানী ঢাকায় হইলেও গত কয়েক বত্সরে বিপথগামী কিশোরদের এই অপরাধপ্রবণতা যে সারাদেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে— তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বলিতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত নানা লোমহর্ষক অপরাধের খবর ছাপা হইতেছে সংবাদপত্রে। র্যাব-১ এর সহকারী পুলিশ সুপার জানাইয়াছেন, উত্তরখান এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ রহিয়াছে। এইসব গ্রুপের মধ্যে ছোটখাটো বিষয় লইয়া দ্বন্দ্ব লাগিয়াই থাকিত। স্থানীয় ‘বিগ বস ছোটন’ গ্রুপ ও ‘কাশ্মীরি’ গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব শত্রুতার জেরে খুন হইতে হয় হূদয়কে। বস্তুত ইহা বিশাল এক ডুবোপাহাড়ের চূড়া মাত্র। ২০১৭ সালে উত্তরায় কিশোর গ্রুপের হাতে প্রতিপক্ষ গ্রুপের স্কুলশিক্ষার্থী আদনান কবির খুন হওয়ার পর প্রথমবারের মতো রাজধানীর প্রায় সর্বত্রই গড়িয়া উঠা কিশোর গ্রুপগুলির ভয়ঙ্কর চিত্রটি সামনে আসে। তখনই পুলিশসূত্রে এই ধরনের প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্রুপের নাম জানিতে পারে দেশবাসী— যাহারা খুন, ছিনতাই, অপহরণ ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের সহিত জড়িত। ইহার পর অব্যাহত পুলিশি অভিযান সত্ত্বেও সেই গ্যাং কালচার থামে তো নাই-ই, বরং ইতোমধ্যে তাহার আগ্রাসন বিস্তৃত হইয়াছে দেশব্যাপী— যাহা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলিয়া আমরা মনে করি।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও কিশোর গ্যাং-এর হাতে পরপর বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। তন্মধ্যে হিংস্র কুকুর লেলাইয়া দিয়া সহপাঠীকে হত্যার ঘটনাটি সারাদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করিয়াছিল। খুব একটা ভিন্ন নহে সিলেটসহ অন্যসকল নগরীর চিত্রও। এমনকি উপজেলা পর্যায় হইতেও বিভিন্ন ‘কিশোর গ্যাং’-এর নানাবিধ অপরাধের খবর পাওয়া যাইতেছে নিয়মিত। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগজনক বিষয় হইল, বর্তমানে সরকার মাদকের যে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত, এই কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই সেই মাদকপাচার, ব্যবসা ও সেবনের সাথে জড়িত। নারী ও শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যার যেইসকল ঘটনা জনমনে আতঙ্ক ছড়াইতেছে সেইখানেও এই কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধীদের ভূমিকা উপেক্ষা করিবার মতো নহে। তবে সারা দেশের কিশোর গ্যাং-এর তালিকা পুলিশের নিকট আছে কিনা তাহা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও রাজধানীর কিশোর অপরাধীদের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ যে সম্যকভাবে অবহিত তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু সমস্যা হইল, কম বয়স ও রাজনৈতিক প্রভাবসহ দৃশ্য-অদৃশ্য নানা কারণে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা তাহাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না। পাশাপাশি অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, শুধু গ্রেপ্তারসহ আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এইসব কিশোরকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নহে। ইহার জন্য তাহাদের মা-বাবাকেও সচেতন করা জরুরি। জরুরি কাউন্সেলিং। আমরা বিশেষজ্ঞ নহি, তবে সাধারণ অভিজ্ঞতা হইতে বলিতে পারি যে, পাড়া-মহল্লা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম জোরদার করিতে হইবে। গড়িয়া তুলিতে হইবে পাঠাগার। এই ধরনের কার্যক্রমে শিশুকিশোরদের অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা যত বৃদ্ধি করা যাইবে, গ্যাং কালচার কিংবা কিশোর অপরাধের প্রবণতাও তত হ্রাস পাইবে বলিয়া আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
