‘সিনেমা হল ডিজিটালাইজেশন প্রকল্প’ কতদূর?

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৯, ২২:১২

চলমান চিত্র তথা চলচ্চিত্রের আবেদন একশত বত্সরেও ফুরায় নাই। অন্ধকার ঘরে বৃহত্ রুপালি পর্দায় যখন একজন দর্শক তাহার চাইতে দুই-তিন গুণ বড়ো অবয়বের চরিত্রগুলিকে পর্দাজুড়িয়া দাপাইয়া বেড়াইতে দেখে, তখন সে অদ্ভুত এক কল্পলোকে চলিয়া যায়। প্রায় ছয়দশক পূর্বে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর এইদেশে একসময় প্রায় ১৩ শত সিনেমা হল রমরমা ব্যবসা করিতেছিল। প্রযুক্তির বিবিধ বিকাশে সেই ব্যবসায় একসময় ধস নামে। বাংলা সিনেমায় কেন পূর্বের মতো জনপ্রিয় তারকা তৈরি হইতেছে না—সিনেমার বিবিধ সমস্যা লইয়া গত এক মাসে ইত্তেফাকে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হইয়াছে।

সারা বিশ্বেই চলচ্চিত্র শিল্প যেইখানে নূতন নূতন উচ্চতায় বিকশিত হইতেছে, সেইখানে আমাদের সিনেমা হল কেন বন্ধ হইতে হইতে এখন পৌনে দুইশততে আসিয়া ঠেকিয়াছে? হল-মালিকদের অভিযোগ আছে যে, ভালো বাংলা সিনেমা তৈরি হইতেছে না। তাই দর্শক আসিতেছে না। অন্যদিকে সিনেমায় লগ্নিকারীদের গুরুতর অভিযোগ হইল—কোনো সিনেমা সুপার হিট হইলেও তাহার লগ্নিকৃত অর্থ উঠাইয়া আনা কঠিন হইয়া পড়ে। তাহাদের অভিযোগ, পরিবেশনা সংস্থার ম্যানেজার, বুকিং এজেন্ট, হল রিপ্রেজেন্টেটিভ ও হল মালিকদের বিরুদ্ধে। ই-টিকিটিং সিস্টেম না থাকিবার দরুন একটি শো-তে ঠিক কতগুলি টিকিট বিক্রয় হইল, তাহার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। পুরা প্রক্রিয়ার মধ্যে অস্বচ্ছতার অভিযোগ রহিয়াছে দীর্ঘকাল ধরিয়া।

আমরা হলিউড, বলিউড ও টলিউডে দেখিতে পাইতেছি কীভাবে সিনেমার কনটেন্টের পরিবর্তন ঘটিতেছে। পরিবর্তন ঘটিতেছে দর্শকদের রুচিরও। প্রথাগত ফর্মুলার ছবি হইতে ক্রমশ মুখ ফিরাইয়া লইতেছে উপমহাদেশের দর্শকরা। বাংলাদেশের দর্শকদেরও রুচির পরিবর্তন ঘটিতেছে। তাহারা ভালো ভালো কনটেন্টের ছবি দেখিতে চাহে। অথচ মাল্টিপ্লেক্সের হলগুলি বাদে দেশের বেশিরভাগ একক-প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ রুচিশীল দর্শকদের জন্য উপযুক্ত নহে। সুতরাং প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ ও প্রদর্শনী ব্যবস্থা আধুনিক করিবার বিকল্প নাই। এই উদ্দেশ্যে সরকারের ‘সিনেমা হল ডিজিটালাইজেশন প্রকল্প’-এর আশু বাস্তবায়ন জরুরি। জানা গিয়াছে, ৫০ কোটি টাকার বাজেটে থাকিতেছে সিনেমা হল সংস্কার, সার্ভার মেশিন স্থাপন, অত্যাধুনিক পর্দা, ডলবি ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম, প্লেয়ার মেশিনসহ আরো বেশ কিছু জিনিস। এই প্রকল্পের আওতায় বত্সরখানেক পূর্বে প্রাথমিকভাবে সারা দেশ হইতে ৮৩টি হল পরিদর্শন করিয়া প্রকল্প কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে ৫২টি হল চূড়ান্ত করেন। ইহার পর তথ্য মন্ত্রণালয় হইতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কমিটি করিয়া আরো একবার এইসব হল যাচাই-বাছাই করা হয়। সেইখান হইতে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে ৪০টি হলের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করা হইয়াছে। সেই ৪০টি হলের নাম দিয়া তথ্য মন্ত্রণালয় পুনরায় প্রকল্প কমিটিকে নূতন প্রতিবেদন পাঠাইতে বলিয়াছে। অভিযোগ রহিয়াছে যে, প্রতিবত্সর মন্ত্রণালয়ের সচিব পরিবর্তিত হয়। নূতন সচিবের সবকিছু গুছাইয়া লইতেই ছয় মাস চলিয়া যায়। এই কারণেই নাকি প্রকল্প পাস হইয়া আসিতে দেরি হইতেছে।

চলচ্চিত্রশিল্প এখন ভেন্টিলেশনে চলিয়া যাইতেছে। সুতরাং এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাম্য নহে। পাশাপাশি ই-টিকিটিং ব্যবস্থা যাহাতে অতি শীঘ্রই চালু করা যায়, সেইদিকে সবিশেষ নজর দিতে হইবে। আজ জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচানোই হউক আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।