ঊনপঞ্চাশে পা রাখা প্রদীপ হালদারের বিশ্বাস, একদিন তিনি তার ইচ্ছের গন্তব্যে পৌছবেনই। ভারতের নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জের সীমান্ত-ঘেঁষা গ্রাম প্রতাপপুরের বাসিন্দা প্রদীপ ১৭ বার জয়েন্ট এন্ট্রান্স বা ভর্তি পরীক্ষার পরেও এমবিবিএস ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ও সঙ্কল্পে অটল। জানিয়ে দিয়েছেন, পাশ না করা পর্যন্ত তিনি এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবেন না।
হতদরিদ্র দিনমজুর প্রদীপকে বয়স ও দারিদ্রের সঙ্গে যত না লড়তে হচ্ছে, তার থেকে বেশি লড়াই চালাতে হচ্ছে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের ব্যঙ্গ আর স্ত্রীর গঞ্জনার সঙ্গে। টানা ১৭ বার জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়েছেন। চলতি বছর মেডিক্যালের সর্বভারতীয় অভিন্ন প্রবেশিকাতেও বসেছেন। কাস্তে-কোদাল হাতে সারা দিন অন্যের জমিতে খাটুনির পরেও প্রদীপের চোখে স্বপ্ন, এক দিন এই হাতেই থাকবে স্টেথোস্কোপ।
টিনের চাল আর বেড়ায় তৈরি ভাঙাচোরা ঘর প্রদীপের। বড় মেয়ে নিবেদিতা দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। ছোট মেয়ে অপরাজিতা এবার মাধ্যমিক পাশ করেছে। ছেলে প্রভাকর ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তারা জানায়, বাবা তাদের থেকে অনেক বেশি পড়াশোনা করেন। তবে স্ত্রী বাসন্তী হালদারের ক্ষোভ, খেদ, ‘ছেলেমেয়েগুলোর মুখে ভাল করে খাবার তুলে দিতে পারি না। আর উনার ডাক্তার হওয়ার জেদ! এই পাগলের পাল্লায় পড়ে জীবন শেষ হয়ে গেল।’
এই ‘পাগলামি’র মানে জানতেন প্রাচীন কালের মুনিঋষিরা। আপনি জানলেন কী ভাবে? প্রদীপ বলেন, ক্লাসে প্রথম হতেন। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু অভাবের জ্বালায় মাধ্যমিকের পরে পড়া ছেড়ে মাঠে নামতে হয়। ১৯৯৮ সালে একটা কাগজের ঠোঙা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাতে বিজ্ঞাপন ছিল, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি বয়সে পড়া যাবে। সেখান থেকে ২০০০ সালে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ‘‘আমার মনে হয়েছে, ভগবান এ ভাবে সুযোগ করে দিয়েছেন। পাশ করলেই সকলের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।’
প্রদীপের চোখে জ্বলজ্বল করে ওঠে শিক্ষাদীপ। ২০১৩ সালে কলকাতার চিকিৎসক অমিয়কুমার মাইতির সঙ্গে আলাপ হয় প্রদীপের। তিনি বিনা পয়সায় পড়াতে থাকেন। বই দেন। পরীক্ষার আগে নিজেকে প্রস্তুত করেন প্রদীপ। অমিয় বললেন, ‘এত চেষ্টা, এত নিষ্ঠা সচরাচর দেখা যায় না। উনি ঠিক পাশ করবেন।’ এক দিন সকলেই বলবে, ওই যে যাচ্ছে প্রদীপ হালদার, এমবিবিএস! এটার শোনার অপেক্ষায় দিন গুনছেন অধ্যাবসায়ী প্রদীপ। আনন্দবাজার।
ইত্তেফাক/আনিসুর
