নিয়মভাঙা শৌর্য ও ক্ষমতার প্রতীক হলে দুর্ঘটনা ঘটবেই

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫৬

ড. মো. নাছিম আখতার

প্রতিটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য রয়েছে রাষ্ট্রীয় আইন। এই আইন করা হয় রাষ্ট্রের অখণ্ডতা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। কিন্তু ক্ষমতা ও অর্থের বলে যখন এসব আইনকে অবজ্ঞা করা হয়, তখন সমাজ হয়ে পড়ে অস্থির এবং সমাজে ঘটে নানা ধরনের দুর্ঘটনা যা প্রতিরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। নিয়মভঙ্গের প্রবণতা সর্বাধিক পরিলক্ষিত হয় সমাজের ক্ষমতাবান মানুষের মধ্যে। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র মানুষ তুলনামূলকভাবে আইনের প্রতি অধিক  শ্রদ্ধাশীল।

বর্তমান সমাজে নিয়ম মেনে চলাকে এক ধরনের দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। আমরা মনে করি, নিয়ম হলো বোকা এবং দুর্বল মানুষের জন্যে প্রযোজ্য। তাই নিয়ম ভঙ্গের মধ্যেই আমরা দম্ভের পরিতৃপ্তি পেয়ে থাকি। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে যাই। আমন্ত্রণপত্রে লেখা থাকে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ও মোবাইল ফোন অনুষ্ঠানস্থলে নেওয়া নিষেধ। আমন্ত্রণপত্রের নির্দেশনা আমিসহ অনেকেই মেনে চলি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে ভেতরে ঢোকার সময় গাড়িতে মোবাইল রেখে যাই। এরপরও নিরাপত্তারক্ষীরা জিজ্ঞেস করেন, সঙ্গে মোবাইল ফোন আছে কিনা? উত্তরে বলি, না। কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলে যাওয়ার পর অনেকের হাতেই মোবাইল ফোন দেখি এবং এখানে-ওখানে ছবি তুলতে দেখি। শুধু ছবি তুলেই তারা ক্ষান্ত হন না, সেই ছবিগুলো আবার ফেসবুকে পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখেন: ‘বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে’। আমন্ত্রণ কার্ডে যেহেতু ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ও মোবাইল ফোন নেওয়া নিষেধ, তখন ভেবে নিতে হবে নিঃসন্দেহে তা নিরাপত্তার খাতিরে করা হয়েছে। তবুও আমাদের মতোই শিক্ষিত মানুষ সে নিয়ম মানতে নারাজ।

কোনো বড় শহরে যখন রাস্তা দিয়ে যাই, দেখি রাস্তার দুপাশের বিশাল অট্টালিকাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটি প্রায় গায়ে গায়ে লাগানো। এদের মধ্যে দূরত্ব এতই কম যে একটির জানালা দিয়ে আরেকটির জানালা ছোঁয়া যায়। এক্ষেত্রে মানুষের বিবেচনা বোধের চিত্রটি প্রকাশ পায়। ভাবি, না মরতেই মানুষ নিজের বাসস্থানকে কবরস্থানে পরিণত করেছে। দিনের বেলাতেও কোথাও কোথাও রাতের মতোই অন্ধকার। একটির মধ্যে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে পাশের বিল্ডিংটিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যের প্রয়োজনে নয়, খোলামেলা বাড়ি নিজের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে আমি মনে করি। অথচ মানুষ বিল্ডিং কোড না মেনে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় এমন নিয়ম-বহির্ভূত কাজ করে যাচ্ছে।

এমনটি কেন হচ্ছে? যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে তিনটি বিষয় আমার সামনে প্রতিভাত হয়। তদারককারী সংস্থার উদাসীনতা, নয়তো বাড়ি তৈরির সময় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ প্ল্যান পাস, অথবা বাড়ির মালিক এত ক্ষমতাধর ও অর্থশালী যে রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতিকে তিনি পাশ কাটিয়ে চলতে পারেন। এফ আর টাওয়ারের কথাই ধরা যাক। এই ভবনটির অনুমোদন ছিল ১৮ তলা পর্যন্ত। নিয়মবহির্ভূতভাবে তা ২২ তলা হলো কীভাবে? কোন্ অদৃশ্য শক্তির বলে নিয়ম ভঙ্গকে প্রশ্রয় দেওয়া হলো তা ভাববার সময় এসেছে। আবার চকবাজারের চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ড ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছিল মানুষের লোভ ও নিয়ম ভঙ্গের কারণে। অনেক আগেই সরকারিভাবে নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও এ এলাকা থেকে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম সরানো হয়নি। লোকালয়ে কেমিক্যাল গুদাম রেখে এলাকাকে সুপ্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করে রেখেছিল স্বার্থান্বেষী প্রভাবশালী কিছু মানুষ।

নগর দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় আমরা কতটুকু প্রস্তুত? ২০১০ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, শুধু ঢাকা শহরে ৯০ শতাংশের বেশি বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাপনা ও জরুরি নির্গমনের কোনো প্রস্তুতি নেই। আরো সুনির্দিষ্টভাবে যদি জরিপের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যায়, মাত্র ৫ শতাংশ বহুতল ভবন জরুরি নিগর্মন গাইড লাইন অনুসরণ করে। মাত্র ৩ শতাংশ ভবনে ফায়ার লিফট্ আছে, ৬০ শতাংশ ভবনে কোনো জরুরি অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নেই, ৬৪ শতাংশ ভবনে কোনো ফায়ার অ্যালার্ম নেই এবং মাত্র ৩১ শতাংশ ভবনে পানির রিজার্ভার বা জলাধার আছে। তাছাড়া বেশির ভাগ ভবনে নেই কোনো প্রশিক্ষিত অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা। যদিও ৮০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনির্বাপক ইকুইপমেন্ট রয়েছে। কিন্তু সেগুলো ব্যবহার উপযোগী কিনা সে বিষয়ে নিয়মিত মনিটরিং হয় কিনা বলা মুশকিল। এই হলো সার্বিক অগ্নিব্যবস্থাপনার হালচাল। এখানেও দেখা যাচ্ছে নিয়মের ব্যত্যয়।

ঠিক একই অবস্থা বিরাজ করছে পরিবহন সেক্টরে। ড্রাইভারদের অধিকাংশই লাইসেন্সবিহীন। আবার লাইসেন্স থাকলেও গাড়ি চালানোর সময় সড়ক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে অনীহা লক্ষ করা যায়। সম্প্রতি নিজের গাড়ি নিয়ে আইসিটি মন্ত্রণালয়ে একটি মিটিং-এ যাচ্ছিলাম। হঠাত্ পেছন থেকে হাইড্রোলিক হর্ণের তীব্র শব্দ আমার কানে বাজলো। লক্ষ করে দেখি একটি প্রাইভেট কার দ্রুতগতিতে আমার গাড়ির বামদিক দিয়ে ওভারটেক করার চেষ্টা করছে। আমি আমার ড্রাইভারকে ডানে সরে যেতে বললাম। কিন্তু ডানে আরেকটি গাড়ি থাকার কারণে সরতে কিছুটা বিলম্ব হলো। বামদিক দিয়ে ক্রস করার সময় ঐ প্রাইভেট কারটির ড্রাইভার কিছু বলে বকা দিলো বলে আমার মনে হলো। প্রত্যুত্তরে আমার ড্রাইভার ইশারায় চড় দেখালো। ৫০০ গজ সামনে গিয়ে দেখি আমার বামদিক দিয়ে ওভারটেক করা ড্রাইভার আমাদের গাড়ির সামনে তার গাড়ি রেখে আমাদের গতি রোধ করেছে। দুই ড্রাইভারই মুখোমুখি। একজন আরেকজনকে পারলে মারে, আমি মধ্যস্থতাকারী। অনেক কষ্টে দুজনকে ঠেকালাম। আমার ড্রাইভারের বক্তব্য: বাম দিয়ে দ্রুতগতিতে ওভারটেক এটা অন্যায়, তাকে গালি দেওয়া আরেকটি অন্যায় এবং আমাদের গতি রোধ করা চূড়ান্ত অন্যায়। সে আমাকে বললো, ‘এতগুলো অন্যায়ের পরও তাকে উচিত শিক্ষা দিতে দিলেন না স্যার’। তার কণ্ঠ শুনে মনে হলো আমার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাতে সে খুবই হতাশ।  যানবাহনের ফিটনেস দেখার জন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। রাস্তায় যানবাহন চলাচলের নিয়মকানুন মানা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ। তাদের দায়িত্ব পালনের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। যখন কোনো দুর্ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন শুরু হয়, তখনই রাজধানীতে গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। কারণ তখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তত্পর থাকেন গাড়ির কাগজ পরীক্ষা করতে। এখানেও কিন্তু আমরা দেখছি পরিবহন সেক্টরের অরাজকতার মূলে আমাদের লোভ, নিয়ম ভঙ্গের প্রবণতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার দায়ী।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, নিয়ম ভঙ্গে আমরা এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি খুঁজে পাই— যা দেশ ও সমাজের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত করে। পরিণামে ঘটতে পারে যেকোনো দুর্ঘটনা। তাই আইন ও নিয়ম ভঙ্গকারী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তার শাস্তি নিশ্চিত করাই হবে এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায়। 

n লেখক : অধ্যাপক, ডুয়েট, গাজীপুর