আয়ান নুহা আলামিন
জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষকে প্রতিনিয়ত কর্মব্যস্ত থাকতে হয়। কখনো শহর থেকে গ্রামে, কখনো গ্রাম থেকে শহরে, আবার কখনো বা বসবাসরত স্থানের নানা পথ ধরে এদিক-ওদিক মানুষকে ছুটতেই হয়। কেউ কেউ আবার পথকেই সঙ্গী করে নিয়েছে। কিন্তু পথ মানুষকে কতটুকু সঙ্গী করতে পেরেছে?
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ পথের বলি হচ্ছে। কত মানুষের জীবন যন্ত্রদানবের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে এর কোনো ইয়ত্তা নেই। মোটকথা সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে অহরহ ঘটে চলছে। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের এমন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে যে, প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় ও টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই দেখা যায় অসংখ্য মানুষ নানাভাবে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শহরে ও সড়ক-মহাসড়কে বেশিরভাগ এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। ফলে অকালে ও আকস্মিক মৃত্যু বা পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে দেশের অসংখ্য নিরীহ মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও পথচারীকে। দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই বেশিরভাগ গাড়ির চালক পালিয়ে যায়।
বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায় যে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ মারা যায়। দৈনিক গড়ে ২০ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। পঙ্গুত্ব হচ্ছে প্রায় বারো হাজার মানুষ এবং দুর্ঘটনাস্থলে আহত হয় বিশ থেকে ত্রিশ হাজার মানুষ। রাজধানীতে নিহতদের ৭২%ই পথচারী। সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা। যা দেশ বছরে হারাচ্ছে জিডিপির ২-৩%। এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে। সড়ক দুর্ঘটনার এসব কারণ একটু ক্ষতিয়ে দেখলেই সবার আগে চলে আসে যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, চালকদের অসাবধানতা, লাইসেন্সবিহীন কিংবা অনভিজ্ঞ চালক কর্তৃক গাড়ি চালানো, একে-অপরকে ওভারটেক করার প্রবণতা, অতিরিক্ত গতিবেগের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারানো, আবার কখনো কখনো চালক থাকা অবস্থায়ও হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো ইত্যাদি। এতো ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ঘটনার পরেও নেই কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ। বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে যাওয়া শরীরগুলোর বিচারের জন্য স্লোগান তুলে কেবল সাধারণ শিক্ষার্থীরাই। মিডিয়াগুলো তখন বড় বড় সংবাদের জন্য ওতপেতে থাকে কিন্তু সন্তান হারানো মায়ের চিত্কার পৌঁছাবে না ক্ষমতায় জিম্মি আইনের কানে। কয়েকদিন মিছিল-মিটিং, বিক্ষোভ সমাবেশ, র্যালি হবে। কিছুদিন পরেই আবার মানুষ ভুলে যাবে এসব দুর্ঘটনার কথা। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যা বোধসম্পন্ন মানুষের মনকেও দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। স্রেফ দুর্ঘটনা হলেও, মানতে খুব কষ্ট হয়। এমন দুর্ঘটনা প্রতিদিনই আমাদের দেশে ঘটে। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে কিছু দুর্ঘটনা অন্য সব দুর্ঘটনা থেকে মুখ্য হয়ে উঠে। এ নিয়ে কিছুদিন আলাপ-আলোচনা হয়, তারপর থেমে যায়। এমন আরেকটি দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত আমাদের চৈতন্য জাগ্রত হয় না। কয়েকটা লাশ না পড়লে আমরা কেমন যে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাই না। কয়েকটা লাশ পড়ার পরেই আমরা প্রতিবাদী হয়ে উঠি। অথচ এই চলমান দুর্ঘটনা জাতীয় জীবনে দুর্যোগ হয়ে রয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই।
সন্তান, স্বজন হারানোর ব্যথা সেই অনুভব করতে পারে যার হারিয়েছে। আমরা যারা চারিদিকে আছি সবাই মিষ্টির মাছি। কারণ অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়াটা খুব সহজ কিন্তু তার কষ্টটা অনুভব করা খুব কঠিন। কিছুই যেন করার নেই। আমাদের যেন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে একশ্রেণির ড্রাইভারের কাছে আমাদের স্বপ্ন ও আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া। তারা যখন খুশি তখন তা কেড়ে নেবে। এদের প্রতিরোধের যেন কেউ নেই। সরকারের তরফ থেকে কত প্রতিশ্রুতি, কত উদ্যোগের কথা শুনি। কিন্তু দিন শেষে এইসব দুর্ঘটনার জন্য নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ জাতীয় সংসদে অনুমোদন হয়েছে গত সেপ্টেম্বরে। কিন্তু ৯ দফা দাবির বাকি ৭ দফা দাবি এখনো অপূর্ণতায় রয়ে গেলো। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হলেও তাদের সমন্বয়হীনতা ও ধারাবাহিক কর্মসূচির অভাবে দাবিগুলোর জোর যেন ফিকে হয়ে গেছে।
n লেখক:শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ
