‘পরিবেশ দূষণে বিপর্যস্ত সাভার :উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভার আজ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সাভার হয়ে উঠেছে ঢাকা শহরের বর্জ্যের ভাগাড়। নদী-খাল দখল করে বাড়িঘর, মিল-কারখানা, বিনোদন কেন্দ্র ও হাউজিং প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে এ অঞ্চলে। কল-কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত বর্জ্যের দূষণে ও দখলের ফলে এখানকার নদী ও খাল আজ মৃতপ্রায়। ৩০০ ফুট খাল এখন ১০ ফুট-এ পরিণত হয়েছে। যতটুকু আছে তার পানিও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সাভার অচিরেই পুরোপুরি দূষণের নগরীতে পরিণত হবে।
গতকাল বুধবার সাভার সেনানিবাস গলফ ক্লাবে গলফ হাউজ মিলনায়তনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এমব্যাসি অব দ্য ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মান এর সহযোগিতায় এ সেমিনারের আয়োজন করে বেলা, এএলআরডি, নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ, নিজেরা করি ও টিআইবি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সেমিনার থেকে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি। পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন রেজাউল করিম বাবলু এমপি, খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন এমপি, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্থপতি ইকবাল হাবিব, চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক আবু বকর সিদ্দিকী, সাভার পৌর মেয়র আব্দুল গনি, সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রাসেল হাসান, সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মোল্লা, সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন খান নঈম প্রমুখ।
সভায় বক্তারা বলেন, ডিইপিজেড, চামড়া শিল্পনগরী ও বিভিন্ন মিল-কারখানার নির্গত বর্জ্য, ইটভাটার কালো ধোঁয়া এ এলাকার পরিবেশকে বিষময় করে তুলেছে। বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদী, খাল-বিলে ফেলা হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলে পাঁচ হাজার একর কৃষি জমি আজ হুমকির মুখে। মত্স্যসম্পদ বিলুপ্তির পথে। বিষাক্ত বর্জ্যে মাছ মরে ভেসে উঠছে। মানুষের দেহে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হচ্ছে। সেমিনারে আরও বলা হয়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বংশী নদীর ৬৫ জন দখলদারের তালিকা প্রস্তুত করা হলেও তা উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। কর্ণপাড়া খাল দখল করে বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ হলেও তা উচ্ছেদের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। আমিনবাজার ডাম্পিং স্টেশনে ময়লা আবর্জনায় বিষময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বিকট দুর্গন্ধে এলাকার জনসাধারণের টেকা দায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত মনিটরিং ও তদারকির অভাবে দখল-দূষণে সাভার আজ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশকে প্রাধান্য দিতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার আপসহীন। শিল্পপতি কিংবা পরিবেশ দূষণকারী ও দখলকারীরা যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। দখল ও দূষণ এর কবল থেকে রক্ষা করে সাভারকে আগামী দিনে বাংলাদেশের মডেল শহর হিসেবে দাঁড় করানো হবে। তিনি আরও বলেন, আইন যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ হতো বা বিভিন্ন দপ্তর যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করত তাহলে আজ আমাদের এ সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো না।
ড. সুলতান আহমেদ বলেন, পরিবেশসম্মত শিল্পকারখানা তৈরি করতে হবে। অচিরেই টাস্কফোর্স তৈরি করে যেসব শিল্পকারখানা পরিবেশ আইন অমান্য করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সাভারে অপরিকল্পিতভাবে ডাম্পিং স্টেশন, ইপিজেডসহ অসংখ্য মিল-কারখানা, ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। কারখানাগুলোতে ইটিপি থাকলেও তা চালু থাকে না।
সেমিনারে এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ট্যানারির সিইটিপি কার্যকর করা, ধলেশ্বরী নদীর পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা, ইপিজেডে পরিবেশ আইনের কার্যকর প্রয়োগ, কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইটিপি চালু নিশ্চিত করা, আমিনবাজার থেকে ডাম্পিং সাইট স্থানান্তর, বিকল্প ইট উত্পাদন, সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদী ও খালগুলোর সীমানা ফিরিয়ে আনা, বংশী নদীর দখলদার উচ্ছেদ, মধুমতি মডেল টাউনের মাটি অপসারণ, সকল অবৈধ আবাসন উচ্ছেদসহ একাধিক সুপারিশমালা তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে সাভারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শাহনাজ বেগম, নাসির উদ্দিন পিন্টু, শামসুন্নাহার, নূরুল ইসলাম মল্লিক, আব্দুল হালিমসহ অনেক ভুক্তভোগী তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। সেমিনারের পূর্বে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধিগণ আমিনবাজার ডাম্পিং স্টেশন, চামড়া শিল্পনগরী ও কর্ণপাড়া খালের দূষণ-দখলের চিত্র পরিদর্শন করেন।
