অযত্ন-অবহেলার শিকার ব্রিটিশ আমলে নির্মিত মেলান্দহের ডিস্ট্রিক্টপোর্ট সড়ক। ঝিনাই সেতুর পশ্চিমে নলেরচর তালতলা হয়ে রেলক্রসিং বা ঘুন্টিঘরের সামান দিয়ে সাধুপুর ঘেঁষে মেলান্দহ (দাগি) রেলস্টেশনে সংযোগ হয়েছে। যা জামালপুরের শেষ সীমানা বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত পৌঁছেছে ডিস্ট্রিক্টপোর্ট সড়ক। জামালপুর, শেরপুরের একাংশ, মেলান্দহ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জবাসীর একমাত্র চলাচলের রাস্তা ছিল এটি। প্রশাসনিক প্রয়োজন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ভরসা ছিল ডিস্ট্রিক্টপোর্ট সড়কটি। সেই আমলের একমাত্র যানবাহন কাঠের চাকার গরুর গাড়ি লাইন ধরে যাতায়াত করতো। রাতে এই গরুর গাড়ির চাকা ঘোরার শব্দে ঘুমিয়ে থাকা মানুষকে জাগিয়ে দিতো। জামালপুর সাব-ডিভিশনাল অফিস রাস্তাটি বাস্তবায়ন করে।
একই সময়ে জামালপুরের চারদিক থেকে রাস্তার সংযোগ দেওয়া হয়। ভৌগোলিক কারণে জামালপুর হয়ে ওঠে বন্দরনগরী। জল-স্থলপথে বহুজাতিক পণ্য দেশে-বিদেশে বেচা-কেনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই রাস্তার গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। তখন থেকেই এর নাম দেয়া হয় ডিস্ট্রিক্টপোর্ট সড়ক। স্থানীয়রা এখনো ডিস্ট্রিক্টপোর্ট রাস্তা হিসেবেই চিনেন।
ব্রিটিশ সরকার ডিস্ট্রিক্টপোর্ট সড়কের পাশেই দাগি নামে রেল স্টেশন নির্মাণ করে। কিন্তু স্টেশন এলাকার মাটি দেবে জলাশয়ের সৃষ্টি হয়। দাগি রেল স্টেশনটি প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে স্থানান্তরিত হয়। ইদানীং দাগির নাম পরিবর্তন করে মেলান্দহ রেল স্টেশন করা হয়েছে। বিকল্প রাস্তা না থাকায় জল-কাদা বেয়ে মানুষ এবং মালবাহী গরুর গাড়ি চলাচল করতে থাকে এই রাস্তায়। পাকিস্তান সরকার জনদুর্ভোগ লাঘবে খরাখালিতে একটি ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। দুটি গার্ডারও নির্মাণ করে। ইতোমধ্যেই তত্কালীন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ রেলক্রসিং করে রাস্তা নির্মাণের আপত্তি করে। পাল্টা-পাল্টি মামলার একপর্যায়ে ব্রিজ নির্মাণ ও রাস্তার উন্নয়ন ভেস্তে যায়। দেশ স্বাধীনের পর ’৯০ দশকে খরাখালিতে নিম্নমানের একটি ফুট ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। ব্রিজটি পথচারী-মোটর সাইকেল পারাপার ছাড়া কোনো কাজে আসছে না। এই ব্রিজ দিয়ে ভটভটি/নছিমন গাড়িও চলাচল করতে পারে না। কিছু লোক রাস্তার উপর ঘর তুলেছে। ফলে কৃষিপণ্যসহ আনুষঙ্গিক মালামাল বেচা-কেনায় মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। শুধু যানবাহন চলাচলের অনুপযোগীর অজুহাতে মুমূর্ষু রোগীর চিকিত্সার জন্য ডাক্তার কিংবা ছেলে-মেয়েদের ভালো পাত্র-পাত্রীর সম্বন্ধও আসে না। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এই এলাকার মানুষ শিক্ষা গ্রহণেও অনীহা আছে।
এরশাদ সরকারের তত্কালীন ধর্মসচিব এম এ রশিদ চিশতী নিজামীর হস্তক্ষেপে একটি বিকল্প সিএন্ডবি রাস্তা নির্মিত হয়। যা এখন বিশ্বরোডে রূপান্তরিত হয়েছে। এরপরও এই ডিস্ট্রিক্টপোর্ট রাস্তার গুরুত্ব কমেনি। বিশ্বরোড হয়ে যতক্ষণে মেলান্দহ শিমুলতলী পৌঁছবে— ডিস্ট্রিক্টপোর্ট রাস্তায় নলেরচর তালতলা ঘুন্টিঘর হয়ে ইসলামপুরের কাছাকাছি যাওয়া যাবে। মজার বিষয় হচ্ছে, শুধু তালতলা থেকে মেলান্দহ রেলস্টেশন পর্যন্ত যেতেই সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তা কমে যাবে। হুমায়ুন কবির সোনাহার বলেন, অবহেলিত এই রাস্তার উন্নয়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার গেলেও কোনো সাড়া পাইনি। এদিকে মেলান্দহ এলজিইডি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো কাজই হবে না। স্থানীয়দের প্রশ্ন সারাদেশেই রেলক্রসিং করে রাস্তা নির্মাণে বাধা নেই। শুধু এই রাস্তার বেলায় আপত্তি কিসের? রেলক্রসিং ছাড়াও রাস্তাটি সচল করা যায়। যদি পাঁচ নম্বর চর থেকে তালতলা পর্যন্ত জামালপুরগামী রাস্তার বুজরুত আলী চেয়ারম্যানের বাড়ির পূর্বাংশ থেকে ডিস্ট্রিক্টপোর্ট রাস্তার গামারতলা পর্যন্ত সংযোগ আছে। শুধু রাস্তা সংস্কার-খরাখালি ব্রিজটি যান চলাচল উপযোগী এবং পাঁচ নম্বর চর হাইস্কুল পর্যন্ত রাস্তাটি পাকা করলেই জনদুর্ভোগ লাগব হবে।
ইত্তেফাক/নূহু
