হিজলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ টিপু সিকদারের ছেলে তন্ময় সিকদারের অমানুষিক নির্যাতনে সদ্য মাধ্যমিক পাশ করা এক ছাত্র শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার পুরো শরীরে সিগারেটের ছ্যাকা ও ব্লেড দিয়ে ক্ষত–বিক্ষত করা হয়েছে। নির্যাতিত মোসাদ্দেক (১৮) পার্শ্ববর্তী মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার আন্ধার মানিক ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের কামাল সিকদারের ছেলে।
গতকাল শনিবার রাতে শেবাচিমে গিয়ে দেখা গেছে, নির্যাতনের কারনে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে মোসাদ্দেক। তার ফুফা ফজলে করিম জানায়, মোসাদ্দেক উপজেলা চেয়ারম্যান টিপু সিকদারের ছেলে তন্ময় সিকদারের সঙ্গে একত্রে চলাফেরা করতো। চার দিন পূর্বে মোবাইল ফোনে জরুরী প্রয়োজনে পিতার কাছে ৫ হাজার টাকা পাঠাতে বলে মোসাদ্দেক। পরদিন আরো ১০ হাজার টাকা বিকাশ করে পিতার কাছ থেকে নিয়েছে মোসাদ্দেক। পরবর্তীতে মোসাদ্দেকের পিতা জানতে পারেন তার ছেলেকে চেয়ারম্যান পুত্র আটকে রেখে নির্যাতন করে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে এ ভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
বিষয়টি জানাজানি হলে শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে উপজেলা চেয়ারম্যানের ছেলে এবং তার লোকজন মোসাদ্দেককে মুমূর্ষু অবস্থায় তার বাড়িতে পৌছে দিয়ে যায়। তখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার চেষ্টা করলে চেয়ারম্যানে ছেলে ও তাদের লোকজন বাঁধা দেয়।
শনিবার মোসাদ্দেকের মা ঢাকা থেকে গিয়ে গোপনে তার ছেলেকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে যান। মোসাদ্দেককে গুরুতর অবস্থায় হাসাপাতালে ভর্তির খবর পেয়ে শনিবার দুপুর ২টার দিকে তন্ময় সিকদার লোকজন নিয়ে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় হুমকি ধামকি দেয় বিষয়টি নিয়ে বারাবাড়ি না করার জন্য শাসিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন মোছাদ্দেকের মা মরিয়ম বেগম। তিনি নিজে ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করেন আর মোসাদ্দেকের পিতা কামাল হোসেন ন্যাশনাল ব্যাংকের বনানী শাখায় কর্মরত।
বাবা-মায়ের অবর্তমানে মোসাদ্দেক দাদীর কাছে গ্রামের বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করতো। এসএসসি পাশের পর মোসাদ্দেক ঢাকায় গিয়ে ভর্তি হতে চাইলে চেয়ারম্যান পুত্র তাতে বাধা দেন। মোসাদ্দেকের দাদী নুরজাহান বেগম জানান, চেয়াম্যান পুত্র তম্বয়ের সঙ্গে তার নাতীর সখ্যতা ছিল। তারা একে অপরের বাড়িতে যাতায়াত করতো। মোসাদ্দেক প্রায় রাতেই তম্বয় সিকদারের বাড়িতে থাকতো। নানান অজুহাতে সে পিতার কাছ থেকে টাকা এনে তম্বয়কে দিতো। তম্বয় সিকদারের কাছে মোসাদ্দেক ছিল অনেকটা সোনার ডিম পাড়া হাসের মত। তাই তম্বয়নের ঢাকা চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি তম্বয় সিকদার। এ কারনেই তাকে নিজ বাড়িতে তিন দিন আটকে রেখে নির্যাতন করেছে।
নির্যাতনের পর মোসাদ্দেককে বাড়িতে দিয়ে যাওয়ার সময় তম্বয় বলে গেছেন মোটর সাইকেল দুঘর্টনায় সে আহত হয়েছে। কিন্ত মোসাদ্দেকের দাদী নুরজাহান বেগম নাতীকে পার্শ্ববর্তী মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করতে চাইলে তম্বয় দলবল নিয়ে বাধা দেয়।
হিজলার উপজেলা চেয়ারম্যান টিপু সিকদার জানান, তিনি গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকায় রয়েছেন। যে কারণে বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানেন না। তিনি বলেন, মোছাদ্দেক আমার ছেলের সাথে একত্রে থাকতো। সে কখনো আমার ছেলের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেনি। তাছাড়া তার শরীরে যে সিগারেটের ছ্যাকা এবং ব্লেডে দিয়ে কাটাসহ পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে সে বিষয়ে আমাকে কেউ কিছু জানায়নি। তবে গত এক সপ্তাহ পূর্বে মোসাদ্দেক মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলো বলে উপজেলা চেয়ারম্যান দাবী করেন।
শেবাচিম হাসপাতালের সার্জারী ইউনিট-১ এর আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মশিউল আলম বলেন, মোছাদ্দেক এর শরীরের বিভিন্ন স্থানে বার্ণের স্পট রয়েছে। এ গুলো সিগারেটের আগুনের ছ্যাকার কারনে হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লেড দিয়ে কাঁটাসহ আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মুখের একটি দাঁতও ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। গলায় আঘাতের কারণে মোসাদ্দেক কথা বলতে পারছে না বলে চিকিৎসক জানান। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে পানি জমায় এখন পর্যন্ত তাকে পুরোপুরি ভাবে শংকামুক্ত বলা সম্ভব নয়।
হিজলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম মাকসুদুর রহমান এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আমরা খবর পেয়ে একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে বরিশাল মেডিকেলে খোঁজ নিতে পাঠিয়েছি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রভাবশালীর ছেলে বলে কেউ ছাড় পাবে না।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান টিপু সিকদারের ঘরের ভেতরে টানা চার দিন আটকে রেখে চেয়ারম্যান পুত্র তন্ময় সিকদার এ পাশবিক নির্যাতন পালিয়েছে মোসাদ্দেকের ওপর। তম্বয় সিকদার ইয়াবার নেশায় আসক্ত এবং সমকামীতায় অভ্যস্থ। নেশার টাকা জোগাড় করতেই মোসাদ্দেককে আটকে রেখে দফায় দফায় টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তার পিতার কাছ থেকে।
মোসাদ্দেকের ঘনিষ্টরা জানায় এর আগেও মোসাদ্দেক তার পিতার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা এনে তন্ময় সিকদারকে দিয়েছেন। টাকার লোভেই এ অমানবিক ঘটার জন্ম দিয়েছেন চেয়ারম্যান পুত্র।
ইত্তেফাক/নূহু
