নব্য জেএমবির শরিয়া বোর্ডের আমিরসহ ৭ জঙ্গি গ্রেফতার

আপডেট : ১২ জুন ২০১৭, ২০:৩২
রাজধানীতে পৃথক ঘটনায় নব্য জেএমবির শরিয়া বোর্ডের আমিরসহ সন্দেহভাজন সাত জঙ্গিকে গ্রেফতার হয়েছে। নিউমার্কেট এলাকা থেকে নব্য জেএমবির ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। অপরদিকে, ডেমরা এলাকা থেকে নব্য জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের শরিয়া বোর্ডের আমির শায়েখ মামুনুর রশিদ ওরফে মামুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
 
নিউ মার্কেট থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলা সোমবার দুপুরে পুলিশের হাতের গ্রেফতার ছয়জনকে ঢাকার হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় বিচারক তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
 
সোমবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, রবিবার দিবাগত রাতে নিউমার্কেট এলাকায় রমজানে নাশকতার বৈঠক করার সময় নব্য জেএমবির ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, জাহিদুল ইসলাম ওরফে জোহা ওরফে বকুল ওরফে মাশরুর (২৩), আবু বকর সিদ্দিক ওরফে আবু মোহাম্মদ (১৯), মোহাম্মদ উল্লাহ আদনান (১৯), মেহেদি হাসান ইমন ওরফে আবু হামজা (২১), খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে আবু মুসাব ও শামসুদ্দীন আল আমিন ওরফে আবু আহমদ। তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনসেট, বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র, নোটবুক, জঙ্গি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্যসংবলিত পেনড্রাইভ ও মেমোরি কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
 
তিনি আরো বলেন, গ্রেফতার হওয়া আদনান নিউ মার্কেট এলাকার একটি মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ান। এজন্য প্রতিদিন তারা সেখানে সমবেত হত। জেএমবি’র কেন্দ্রীয় কমিটি বা মজলিসে শুরার সদস্য সংখ্যা এখন পাঁচজন। তাদের একজনের নাম সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ। আর তাদের পরের স্তরের আরেক নেতা হলেন সাদী ওরফে আবু জান্দাল ওরফে আবু দারদা ওরফে আবু। আবু জান্দাল অস্ত্র ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে গ্রেফতার হওয়া ছয়জনকে সংগঠিত করেছেন। তিনি আরও জানান, জাহিদুল ওরফে মাশরুর এবং আবু মোহাম্মদ একজন আলেমকে হত্যা করতে তার বাড়ি রেকি করেছিল। ওই আলেম জঙ্গি বিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য দেন। যারা বলে ইসলামে জঙ্গিবাদের জায়গা নেই, জঙ্গিদের সঙ্গে যাদের মতবাদ মেলে না, তাদের জঙ্গিরা হত্যা করতে চায়।
 
মনিরুল জানান, গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার বর্ষপূর্তিতে নতুন করে নাশকতা করার জন্য সদস্যদের নির্দেশনা দিয়েছে জঙ্গি সংগঠনগুলো। তা কীভাবে করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করছিল ছয় জঙ্গি। আল-কায়েদা, আল-কায়েদা ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট, আইএসসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন অনলাইনে রোজার মাসে তাদের ভাষায় যারা মুরতাদ, তাদের বিরুদ্ধে আঘাত হানার জন্য অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছে। আইএস বা আল কায়েদার সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিদের সাংগঠনিক সম্পর্ক না থাকলেও আদর্শিক সম্পর্ক থাকায় তারা সেই নির্দেশ বাস্তবায়নে কাজ করে।
 
সোমবার বিকালে র্যাব সংবাদ সম্মেলনে জানায়, সোমবার সকাল সাতটার দিকে ঢাকার ডেমরা এলাকা হতে শায়েখ মো. মামুনুর রশিদ ওরফে মামুনকে গ্রেফতার করা হয়। তার গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুর।  মামুন বর্তমানে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের শরিয়াহ বোর্ডের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কারণেই সে এ দায়িত্ব পেয়েছিল। তিনি ২০০২ সাল  থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত মালিবাগ চৌধুরী পাড়ার একটি মাদ্রাসায় দাওরা হাদিস সম্পন্ন করেন। এরপর ২০০৪ সাল হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে দারুল উলুমে পড়াশুনা সম্পন্ন করেন। পড়াশুনা শেষ করে ২০০৭ সাল হতে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মিরপুর হযরতপুর ১২ নম্বর পল্লবীতে হাদিস বিষয়ক গবেষণা করেন। মামুন কোরআনে হাফেজ, হাদীস বিষয়ে অত্যন্ত পারদর্শী এবং একজন দক্ষ অনুবাদক।  শায়েখ মামুন পেশায় একজন মাদ্রাসা শিক্ষক। গত ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭ বছর সায়েদাবাদের  বায়তুন নুর মাদ্রাসা শিক্ষকতা করেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি ডেমরার মারকাজুল হিকমা ওমর ফারুক কওমী মাদ্রাসায় ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
 
মামুনের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে র্যাব জানায়,  ২০১৪ সালে জেএমবি-সদস্য তৌহিদ ও ইমামের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে জেএমবিতে যোগ দেয়। ২০১৫ সালে তিনি জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপে যোগদান করেন এবং শরিয়াহ বোর্ডের সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তার কর্মদক্ষতার কারনে ২০১৬ সালে জেএমবির সারোয়ার-তামীম গ্রুপের শরিয়াহ বোর্ডের আমীর নির্বাচিত হন। শরিয়াহ বোর্ডে ১০/১৫ জনের একটি দল কাজ করে। এই বোর্ডের কাজ মূলত বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত ম্যাগাজিন, বই, লিফলেট এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন উগ্রবাদী মতাদর্শকে বাংলায় অনুবাদ করে জেএমবির সারোয়ার-তামীম গ্রুপের আলেম বোর্ডের মাধ্যমে সকলের কাছে দেয়া। আলেম বোর্ডের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে সুযোগ-সুবিধা বুঝে অনুবাদ করা মতাদর্শ বিভিন্ন মাদ্রাসা, মসজিদ, মজলিশ ইত্যাদি স্থানে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রচার করে থাকে। এছাড়াও অনুবাদকৃত মতাদর্শের নথি দাওয়াতের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
 
ইত্তেফাক/এএম।
 
ইত্তেফাক/কেকে/এএম।