উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর নিজেদের পছন্দের, আরএসএস (?রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ) ?ঘনিষ্ঠ এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির একজনকে প্রথমবারের মতো ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে চাইছে বিজেপি। এক্ষেত্রে আলোচনায় সবার আগে উঠে এসেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের নাম। তবে বিজেপি এখনো এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছুই বলেনি। এর কারণ সুষমা স্বরাজের স্বাস্থ্য। বিকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছে লোকসভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজন, ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাজ্যপাল দ্রৌপদী মুর্মূর নামও।
ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের এই পক্ষ থেকে এই তিনজনের কেউ প্রার্থী হলে সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। এক্ষেত্রে ভোটাভুটি হবে। কারণ জাতীয় কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম-সহ ভারতের বিরোধী ১৭টি দল এক জোট হয়ে জানিয়ে দিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ কাউকে প্রার্থী করা হলে তিনি সর্বসম্মতভাবে রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। এক্ষেত্রে বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে মনোনীত করা হলে তাদের আপত্তি নেই। প্রণব মুখার্জিও সর্বসম্মতিক্রমে হলে দ্বিতীয়বারের জন্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা ভাবতে পারেন বলে জানিয়েছেন। ভোটাভুটি হলে তিনি লড়াইয়ে থাকবেন না। আর নির্বাচন অবধারিত হলে বিরোধী প্রার্থী ঠিক করা হবে। সে ক্ষেত্রে ভারতের জাতির পিতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নাতি তথা পশ্চিমবঙ্গের সাবেক রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীকে প্রার্থী করা হতে পারে।
উত্তরপ্রদেশ, উত্তরখণ্ড, মণিপুর ও গোয়ার বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি সাফল্য পাওয়ায় সর্বসম্মতভাবে হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ রকম পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার তিন সদস্যের বিশেষ প্যানেল গঠন করেছে বিজেপি। রাজনাথ সিং, অরুণ জেটলি, বেঙ্কাইয়া নাইডুকে নিয়ে গড়া এই প্যানেল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক কাজ করবে। তিনজনই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এর মধ্যে রাজনাথ সিং, বেঙ্কাইয়া নাইডু আরএসএস ঘনিষ্ঠ। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ জানিয়েছেন, এই প্যানেল শরিক এনডিএর দলগুলোর সঙ্গেও ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থীর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালাবে। বিজেপি ঘনিষ্ঠ আরএসএস? ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, সঙ্ঘের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী এমন কাউকেই তারা রাইসিনা হিলসে দেখতে চাইছে। তবে গত দু’টি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতই এবারেও উল্টো সুর শিবসেনার। তাই জয় নিশ্চিত করতে বিজেপিকে এমন নাম চূড়ান্ত করতে হবে, যাতে শরিক শিবসেনা তো বটেই বিরোধী শিবিরে থাকা বিজু জনতা দল কিংবা তামিলনাড়ুর প্রয়াত জয়ললিতার দল এডিএমকে যারা বিরোধী জোটে সামিল হয়নি, তাদের সমর্থন মেলে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে জেতাতে আশাবাদী বিজেপি। মোট ভোটের ৫৪ শতাংশ তাদের পক্ষে আসবে বলে আশা করছে এনডিএ শিবির। ভারতের এমপি এবং এমএলএ-দের নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী কলেজ তৈরি হয়েছে। মোট ভোটমূল্য ১০, ৯৮, ৮৮২। জিততে গেলে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪২ মূল্যের ভোট দরকার। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর হাতে রয়েছে সাড়ে ৪৮ শতাংশ ভোট। তবে এর মধ্যে শিবসেনার ভোটও রয়েছে।
বিজেপির সূত্রে জানা গেছে, আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত এবং যার বিরুদ্ধে কোনো চার্জশিট নেই এমন প্রার্থী খোঁজার সময় হয়েছে। ফলে বাবরি মসজিদ মামলায় অভিযুক্ত থাকায় লালকৃষ্ণ আদভানীর রাষ্ট্রপতি পদের দৌড়ে না থাকারই সম্ভাবনা। ভারতের লোকসভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল দ্রৌপদী মুর্মূ এবং আরও কয়েকজনের নাম প্রাথমিক তালিকায় থাকলেও চমক দিয়ে একেবারে আনকোরা কাউকেও বেছে নেওয়া হতে পারে শেষ মুহূর্তে। ঠিক যেভাবে জাতীয় কংগ্রেস পরিচালিত ইউপিএ জমানায় প্রতিভা পাতিলকে বসিয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধী। তাতে বিজেপির শরিকদল শিবসেনার ভোট এসেছিল কংগ্রেসের পক্ষে। পরেরবার প্রণব মুখার্জির সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল। শিবসেনা প্রণব মুখার্জিকে সমর্থন দিয়েছিল। সেই কারণে ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল দ্রৌপদী মুর্মূর নাম আলোচনায় রয়েছে। তিনি আদিবাসী নেত্রী। দ্বিতীয়ত ওড়িশার মানুষ। তাতে ওড়িশার বিজু জনতা দলের সমর্থনের আশা থাকবে। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পেছনে দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি। এক. আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি এবং দুই. রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠ। সুষমা স্বরাজের আন্তর্জাতিক পরিচিতি রয়েছে। বিরোধী দল, বিশেষ করে মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো। তবে মহিলা কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হবে কিনা, তা নিয়েও দ্বিমত রয়েছে। অতীতে মহিলা কাউকে সর্বোচ্চ পদে আনা নিয়ে বিজেপিতে দোটানা ছিল। নারী কাউকে মনোনীত না করার ক্ষেত্রে আরএসএসের তরফ থেকে চাপ থাকবে। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হলে তবেই মহিলা কেউ এনডিএর তরফে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হবেন।
ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ১৭ জুলাই। ভোট গণনা ২০ জুলাই। রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণবের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৪ জুলাই।
ইত্তেফাক/নূহু
