এক ছিল এক ক্ষান্তবুড়ি। তার ছিল এক দিদি। সেই দিদির ছিল এক শাশুড়ি। তো, সেই শাশুড়ি তো ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়িই হবে, না কি?
হলে হোক, আমার আপত্তি নেই। আমার আপত্তি তার কাজ নিয়ে। খুনখুনে হাসি হেসে ছেলেপুলেদের কানে কানে বুদ্ধি দেয় যে! ভালো বুদ্ধি হলে কথা ছিল না। পচা বুদ্ধি যে, তার কী হবে?
কী রকমের পচা বুদ্ধি?
বলতেও ঘেন্না লাগছে ভাই। শুনতে চাইছ বলে বলছি। পরে আবার বলো না যেন, এরকম পচা কথা শুনিয়ে ঘেন্না ধরিয়ে দিলাম!
উঠানে শাড়ি নাড়া। লাল শাড়ি। নীল শাড়ি। নানা রঙের শাড়ি। ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির সংসারে এখন অনেক বউ। ছেলেবউ। নাতিবউ। পুতিবউ। সব বউদের শাড়ি ধুয়ে কেচে উঠানের রোদে নাড়া হয়। পুকুর থেকে উঠে এসে ধোয়া শাড়ি নেড়ে দিয়ে বউরা যে যার মতো কাজে যায়।
ঘরের দাওয়ায় বসা ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ি ঘোলা চোখে শাড়ি দেখে। ঘোলা চোখে সব নাকি আবছায়া, কিছুই নাকি ভালো দেখে না। কেবল নাকি রং বুঝে শাড়ি বোঝে। আবছায়াতেই নাকি বুঝে ফেলে কোন শাড়ির কোন রং, কোন শাড়ি কোন বউয়ের। এক-একদিন এক-একটা শাড়ি পছন্দ করে বেছে নেয়, কোন শাড়িতে পচা বুদ্ধি কাজে লাগাবে। আসলে কোন বউকে সাইজ করবে আজ, সেইটা ঠিক করে তার শাড়ি বেছে নেয়।
তারপর?
ছেলেপুলে সারাদিন খেলে উঠানে। এক-একদিন এক-একটাকে ডেকে এনে কানে কানে পচা বুদ্ধি দেয়। ছেলেপুলেও আজকাল যা হয়েছে না! পচা বুদ্ধি একদিনও মাটিতে পড়তে দেয় না। শাড়িতে লাগিয়ে দেয়।
শাড়িতে লাগানো পচা বুদ্ধিটা—উহু, ঘেন্না ঘেন্না! বলতে হবে বলছি, নইলে এ কথা আমার মুখ দিয়ে বের হয়, বলো?
শাড়িতে লাগানো পচা বুদ্ধিটা হচ্ছে একেবারে যাকে বলে, সর্দি!
সুকুমার রায়ের ‘গন্ধ বিচার’ কবিতা পড়েছ তো? রাজার নাকে গেছে মন্ত্রীর জামার গন্ধ। কেন গন্ধ? মন্ত্রী বলে—গন্ধ তো নয় মন্দ! রাজারা যা করে, বদ্যি ডাকে, এই রাজাও বদ্যিকে ডেকে ঠিক করতে বলল, গন্ধটা মন্দ, না ভালো? বদ্যি গন্ধ শোঁকার ভয়ে আগেভাগেই বলে বসে, আমার নাকে বেজায় হলো সর্দি!
বুঝলে তো? সর্দি জিনিসটা নাকেই থাকে। শাড়িতে নয়, কক্ষনো নয়, থাকা উচিত নয়। কিন্তু জানো, ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির কাজ হচ্ছে, শাড়িতে সর্দি লাগিয়ে দেওয়া। ছেলেপুলেদের বললেই হয়। ভাবছ, ও বাড়ির ছেলেপুলেদের সব দিনই সর্দি লেগে থাকে? মোটেও না। যেদিন সব্বার নাকই খটখটে শুকনো থাকে, সেদিনও শাড়িতে সর্দি লাগানো বন্ধ হয় না। কেননা, নাক ছাড়াও সর্দি হয়, আর সে কথা ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির চেয়ে ভালো আর কে জানে?
নাক ছাড়া সর্দি হয়?
বানালেই হয়।
সর্দি আবার বানায় কে?
ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ি, আর কে?
মিথ্যে মিথ্যি সর্দি বানায় কীভাবে?
জানতে চাইছ বলে বলছি, নইলে এ পচা বুদ্ধির কথা আমি মোটেও বলতে চাই না। ঘেন্না ঘেন্না যা বলি না কেন, বানানোর উপায় কিন্তু পচাও না, ঘেন্নারও না। টগবগ করে ফোটা গরম পানি আধা কাপ নিয়ে এর ভেতর তিন চামচ জেলাটিন দিয়ে কাঁটা চামচ দিয়ে নেড়েচেড়ে নরম হতে রেখে দেওয়ার পর এর সাথে এক কাপের চার ভাগের এক ভাগ ভুট্টার সিরাপ মেশানোর পর আবার কাঁটা চামচ দিয়ে নেড়েচেড়ে একে ঠাণ্ডা হতে দিতে দিতে পরিমাণমতো একটু একটু করে পানি মেশাতে হয়।
এতে ঘটে কী?
ঘটে এক মিউকাস ঘটনা। থিকথিকে মিউকাস ঘটে চিনি আর প্রোটিনের সাহায্যে। এই মিউকাসের যে চেহারা-সুরত, তাতে দেখে ইয়াক থুঃ বলার লোকের অভাব হয় না। কেননা, দেখতে একেবারে আসল সর্দির মতো লাগে।
আসল সর্দি তো মিউকাস-ই। ভাইরাসের পাল্লায় পড়লে ঠাণ্ডা লেগে যায় কখন? যখন ভাইরাস ছানাপোনা নিয়ে নাকের মিউকাস মেমব্রেন কোষে এসে ঠাঁই নেয়। ভাইরাসের সাহায্যে এই কোষের মিউকাস দ্রুত বাড়তে থাকে, থাকে তো থাকেই। টিস্যু পেপার দিয়ে মুছতে মুছতে নাক লাল হয়ে যায়, তবু শেষ হয় না।
সর্দি তো ভালো। ভাইরাস যাতে শরীরের ভেতর না ঢুকতে পারে, ওকে আটকানোর জন্য শরীর নিজে থেকেই এই যুদ্ধটা শুরু করে। সর্দি হলো যুদ্ধের হাতিয়ার। ভাইরাসকে নাকের কোষ থেকে তাড়াতে পারলে বেঁচে যায় বেচারা শরীরটা। আর তাই রংহীন সর্দিকে খারাপ বলা ঠিক হবে না। কিন্তু সর্দি তো সর্দিই, তা-ই না? খারাপ-ভালো বোঝার আগেই ইয়াক থুঃ বলাটা নিয়ম। এই নিয়ম সবাই মানে, সারা বিশ্ব মানে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বলে গেছেন, ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির পাঁচ বোন থাকে কালনায়, মনে আছে তোমাদের? বোনগুলো শাড়ি রাখে উনুনে, হাঁড়ি রাখে আলনায়, মনে আছে তো? মনে যদি থাকে, তবেই চলবে। পাঁচ বোনের সবচেয়ে ছোটটার সেজ ছেলের বড় মেয়ের মেজ ছেলে একবার এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। বেশিদিন আগের কথা নয়। সেই ছেলেটা এমন তেঁদড়, নামটাও কী যেন, তবে ‘ত’ আছে নামের আগে, এইটুকু মনে আছে।
প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল তাকে। আর তাই তো মনের দুঃখ ছেলেটাকে না বলে পারেনি ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ি। বাড়ির বউগুলো সব বজ্জাত। চাইলে কিছু দেবে না। আইসক্রিম খেতে দেবে না। ঘন দুধে হাত ডুবিয়ে খেজুরের গুঁড় খুঁজে এনে কুট করে কামড়াতে দেবে না। হেঁড়ে গলায় শাহ আবদুল করিমের গান গাইতে গেলে ধমকে বলবে, বুড়ো হয়েছেন না!
কত আর সহ্য হয়? ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ি রাগে গজগজ করতে করতে বলেছিল, ইচ্ছে হয়, বউগুলোকে ঝামেলায় ফেলি।
কী ঝামেলায় ফেলা যায়?
ছেলেটা যা ভালো না! উঠানে রং-বেরংয়ের শাড়ি নেড়ে দিয়ে হি হি হো হো করা বউগুলোকে ঝামেলায় ফেলতে শাড়িতেই সর্দি লাগানোর শখ জেগেছিল। আর ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়িকে নকল সর্দি বানানোর বুদ্ধি তো ওই ছেলেটাই দিল। নকল সর্দি বানানোর পর ছেলেপুলেদের ডাকা লাগে। ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ি তো আজকাল আর হাঁটতে পারে না।
কী ভাবছ? সব সময় গরম পানি খেতে বলেছিল ডাক্তার। ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়িকে ফ্লাস্কে করে গরম পানি দেওয়া হয় সব সময়। জেলাটিন আর ভুট্টার সিরাপ বাজার থেকে কিনে এনে দিয়েছিল সেই ছেলেটা। স্টকে এখনো আছে। আবার যখন আসবে, ছেলেটা সাথে করে কি বেশি করে নিয়ে আসবে না? ছেলেটা যা ভালো না!
