দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানাভাবে হেনস্থা হওয়ার ঘটনা ঘটিতেছে। বাড়িতেছে তাহাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করিবার ঘটনাও। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তথাকথিত কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তির মধ্যে কথায় কথায় দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মকর্তাদের চড়-থাপ্পড় মারিবার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাইতেছে—যাহা নিন্দনীয় কিংবা অগ্রহণযোগ্য শুধু নহে, অত্যন্ত বিপজ্জনকও বটে। কিছুদিন আগে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের ঘটনা সরেজমিনে পরিদর্শন করিতে গিয়া শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হইয়াছেন জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায়ও নদীর দুইপাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করিতে গিয়া হামলার শিকার হইয়াছেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। এই ধরনের আরেকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিক্ষোভ করিতেছেন গত কয়েকদিন যাবত্। তাহাদের অভিযোগ, সংস্থার প্রকৌশলীকে ‘থাপ্পড় মারা’র ঘটনা ঘটিয়াছে যাহা অনভিপ্রেত। পাল্টা অভিযোগও অবশ্য রহিয়াছে। উক্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ আচরণের অভিযোগও তুলিয়াছেন অপর একটি পক্ষ।
এই ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সহিত অসৌজন্যমূলক বা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন— তাহা হইলে কী করিতে হইবে তাহা সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধির অজানা থাকিবার কথা নহে। রাষ্ট্রের সংবিধান আছে। সংবিধানের আলোকে প্রণীত বিধিমালা আছে। সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে কাহার কী দায়িত্ব। এমনকি পদানুক্রম, ‘চেইন অব কমান্ড’ এবং কে কাহার নিকট দায়বদ্ধ— তাহাও স্পষ্টভাবে নির্দেশিত আছে। সেই বিধিমালা বা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘিত হইলে কী করণীয় তাহারও নির্দেশনা রহিয়াছে সেখানে। আছে আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থাও। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, কেবল যে কোনো কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠিতেছে তাহাই নহে, কথিত ‘ক্ষমতাধর’দের তালিকায় জনপ্রতিনিধি নহেন এমন ব্যক্তির সংখ্যাই বরং বেশি বলিয়া প্রতীয়মান হয়। তবে জনপ্রতিনিধিদের দায়-দায়িত্ব নিঃসন্দেহে অন্য যে-কাহারও চাইতে বেশি। কারণ তাহারা আইন রক্ষার শপথ নিয়াছেন। অতএব, কোনো অবস্থাতেই তাহাদের নিজের হাতে আইন তুলিয়া নেওয়া উচিত নহে।
দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর গায়ে হাত তোলার বিষয়টি মোটেও সামান্য ব্যাপার নহে। অপকর্মটি কে করিল, তাহার সামাজিক বা রাজনৈতিক অবস্থান কী— তাহাতে কিছু যায় আসে না। এইক্ষেত্রে সেইটি গুরুত্বপূর্ণও নহে। গুরুত্বপূর্ণ হইল, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া হইয়াছে। মনে রাখিতে হইবে যে, দায়িত্বরত ব্যক্তিটি সরকারি কর্মে নিয়োজিত। অতএব, তাহাকে শারীরিক বা অন্য কোনোভাবে লাঞ্ছিত করার অর্থ হইল সরকার তথা রাষ্ট্রকে আঘাত করা। কোনো সরকারই তাহা মুখ বুজিয়া সহ্য করিতে পারেন না। পারা উচিত নহে। সীমালঙ্ঘনকারীদের ব্যাপারে সরকারকে অবশ্যই কঠোর হইতে হইবে এবং রাষ্ট্রের হাত কত দীর্ঘ হইতে পারে তাহাও জানাইয়া দিতে হইবে সুস্পষ্টভাবে। অন্যথায় রাষ্ট্রের কার্যাদি পরিচালনা কঠিন হইয়া পড়িতে পারে। অতএব, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নহে।
