মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। প্রকৃতি মানুষের উপর নির্ভরশীল আবার মানুষ নির্ভরশীল প্রকৃতির উপর। প্রকৃতি মানুষের সব ধরনের বিকাশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। মিশিগান ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক কিছু মানুষকে দুটি দলে ভাগ করেন। তাদের মধ্যে একটি দলকে সবুজ গাছপালা বেষ্টিত উদ্যানে এবং আরেকটি দলকে সিটি স্ট্রিটে পাঠিয়ে দেন। তারা ফিরে আসলে তাদের উপর পরীক্ষা করে দেখা যায় যারা সবুজ প্রকৃতির মধ্যে ছিলেন তাদের স্মৃতিশক্তি আগের চেয়ে ২০% বেড়েছে। কিন্তু যে দলটি সিটি স্ট্রিটে ছিলেন তাদের স্মৃতিশক্তির কোনো উন্নতি ঘটেনি। এ গবেষণা থেকে আমরা বলতে পারি, প্রকৃতি মানুষের স্মৃতিশক্তির বিকাশে প্রভাব রাখে।
অন্যদিকে ডাচ্ বিজ্ঞানীরা প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার মানুষের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখেন যে, যারা শহরের ইট, কাঠ, পাথরের দালানের মধ্যে জীবনযাপন করেন তাদের তুলনায় গ্রামের মানুষেরা দীর্ঘদিন বাঁচেন এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে থাকেন। সবুজ প্রকৃতিতে গ্রামের মানুষেরা থাকে বলে তাদের মানসিক প্রশান্তির স্তর বেশি থাকে। গবেষক কেলি বিডেনওয়েগ তার গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে বলেন যে, প্রকৃতির সাথে সংযোগ যত গভীর হবে বা যতটা বেশি সময় মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে পারবে মানুষের ভাবনার বিকাশ, চিন্তার গভীরতা ও বোঝার ক্ষমতা তত বেশি হবে। এর মাধ্যমে মানুষ তাদের জীবনকে গ্রহণ ও উপভোগ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এই গবেষণাগুলো বলছে, আমরা যত প্রকৃতি ও পরিবেশ বান্ধব হবো আমাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশও তত বেশি হবে। কিন্তু আমরা শহরগুলোকে যেভাবে গড়ে তুলছি সেখানে প্রকৃতির ইতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি ভেবে দেখছি না।
আমরা জানি প্রকৃতি হলো বিশুদ্ধ বায়ু, পানি, গাছ-পালা ও এগুলোর সাথে পারস্পরিকভাবে সম্পৃক্ত অন্যান্য মৌলিক উপাদান। মানুষকে যেমন একটি জীবনধারা অনুযায়ী চলতে হয়, প্রকৃতির এই উপাদানগুলোকেও তেমনি তাদের নিয়ম অনুযায়ী চলতে দিতে হয়। কারণ প্রকৃতির একটি নিজস্ব গতিধারা আছে। এই গতিধারার বিপক্ষে যখন মানুষ যায় প্রকৃতি তখন বিরূপ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। যেমন- চকবাজার, নিমতলি, আরএফ টাওয়ার, ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারের অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ১০ বছরে সারা দেশে ১৬ হাজারের মতো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় ১,৫৯০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ মৃত্যুর দায় আমাদের সকলের। একদিন নিজেদের স্বার্থে আমরা প্রকৃতিকে গলাটিপে হত্যা করেছি, এখন সেই প্রকৃতিই দিনে দিনে মৃত্যুদূত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিগত কয়েকদিনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার প্রেক্ষিতে বিভিন্নজন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, প্রভাব ও এর ফলাফলের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। তবে এই ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পিছনে প্রকৃতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের বিষয়টি তেমনভাবে ভেবে দেখা হয়নি। ঢাকা শহরে যে ইমরাতগুলো তৈরি হচ্ছে সেখানে প্রকৃতির তিনটি মৌলিক উপাদান যেমন- আলো, বাতাস ও পানি প্রবাহের বিষয়টিকে বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, জায়গার অপ্রতুলতার কারণে প্রকৃতির মৌলিক উপাদানগুলোকে তাদের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী চলতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে কোনো না কোনোভাবে আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। কিন্তু ইতিহাস বলছে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যারাই গিয়েছে তাদের উপর দুর্যোগ ও বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রকৃতির সুরক্ষায় আমাদের দায়িত্বহীনতার বিষয়টিও বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিটি ইমারত ও স্থাপনা প্রকৃতি ও পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানসমূহ বিবেচনা করে তৈরির কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। বরং প্রকৃতির উপর আগ্রাসন চালিয়ে আমরা অপরিকল্পিত ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে দালান-কোঠা গড়ে তুলছি। কিন্তু দালানসমূহ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপাদান বিবেচনা করতে হয়। যেমন-পরিবেশ রক্ষা, ভবনের পরিকল্পিত ডিজাইন বা কাঠামো, অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থাপনা, সার্বিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা, পানি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুত্ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এই বিষয়সমূহ নিশ্চিত করে দালান-কোঠাসমূহ নির্মিত হচ্ছে কি না এসব বিষয় পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তবে যারা এগুলো দেখার দায়িত্বে রয়েছেন তাদের দায়িত্বহীনতার বিষয়টি প্রকট হয়ে উঠেছে। এই দায়িত্বহীনতা ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত নাকি অন্য কোনো প্রভাবক শক্তি এর পিছনে কাজ করছে তা বিশ্লেষণ করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠিস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সামগ্রিক স্বার্থকে উপেক্ষা করছে। এই ব্যক্তিস্বার্থের সাথে ব্যক্তির দুর্নীতির বিষয়টিকে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। যে সকল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বিষয় দেখার জন্য সম্পৃক্ত রয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থের ক্রীতদাসে পরিণত হওয়ায় তারা তাদের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচার-বিশ্লেষণের প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন না। ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক বিচরণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
একটি কথা আমরা প্রায় বলে থাকি তা হলো- প্রকৃতি কাউকে ক্ষমা করে না কিংবা প্রকৃতির বিচার কেউ কখনো উপেক্ষা করতে পারে না। ধরি, বিল্ডিং ডিজাইন অনুমোদন ও মনিটরিং-এর জন্য যারা দায়িত্বে আছেন তারা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে যথাযথ নিয়ম না মেনে বিল্ডিং তৈরির অনুমোদন দিলেন। এভাবে নিয়ম না মেনে একটির পর একটি ভবন নির্মাণের মাধ্যমে অবৈধভাবে তারা প্রচুর অর্থের মালিক হলেন। এরপর অবসর জীবন যাপন করতে লাগলেন। কিন্তু ইতোমধ্যে তাদের ছেলে-মেয়েরা উচ্চশিক্ষিত হয়ে তাদেরই দ্বারা অনুমোদিত ভবনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেলেন। ধরে নেওয়া যাক এই ধরনের নির্মিত ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটলো এবং যারা অবৈধ অর্থের বিনিময়ে এই ভবনগুলো নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিলেন তাদের সন্তানরা এই ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। এতে করে তাদের কর্মের ফলাফল ইতিবাচক না হয়ে বরং সারা জীবনের জন্য নেতিবাচক হয়ে গেল। বলতে পারি, এটাই প্রকৃতির বিচার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু, চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু’। এটি তখনই সম্ভব যখন আমরা প্রকৃতিকে বিবেচনায় রেখে দুর্নীতিমুক্ত মন-মানসিকতা নিয়ে নিজেদের আধুনিক ও উন্নত করে গড়ে তুলবো।
n লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
