শিশু তার নিজ পরিবারে বেড়ে উঠবে—এটিই সর্বজনীন। কিন্তু শিশু নানা কারণে তার মা-বাবা অথবা উভয়কেই হারাতে পারে, পারিবারিক বিভিন্ন জটিল সমস্যা অথবা দরিদ্রতার জন্য শিশু তার পিতামাতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। আবার, শিশুরা তার বাবা-মার সঙ্গে থাকা স্বত্ত্বেও তাদের মারাত্মক অসুস্থতা বা মাদকাসক্তির জন্য চরম অবহেলার শিকার হতে পারে। এসব নানা কারণ শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে তাকে পিতা-মাতা বা পরিবার থেকে সাময়িক বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তখন প্রয়োজন পড়ে বিকল্প যত্ন ব্যবস্থার।
বিশ্বজুড়ে বিকল্প শিশুর যত্ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিকল্প যত্নের মধ্যে রয়েছে এতিমখানা, ফস্টার কেয়ার, কিনশিপ কেয়ার, আবাসিক যত্ন, প্রাতিষ্ঠানিক যত্ন এবং কমিউনিটিতে বিদ্যমান বিভিন্ন যত্ন ব্যবস্থা। সমাজে যেসব শিশুকিশোর চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে, তাদের জন্য এই ধরনের বিকল্প যত্ন অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ।
১৬ কোটি জনসংখ্যার এই বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ শিশু—যা মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। ইউনিসেফের মতে, বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি শিশু অভিভাবক হারানোর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং এর প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ শিশু হয় বিকল্প শিশুযত্নের আওতাধীন অথবা যত্ন-বঞ্চিত অবস্থায় রয়েছে। একটি তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে এক জন শিশু পিতামাতার যত্ন থেকে বঞ্চিত বা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘ ২০০৯ সালে প্রথম বিকল্প শিশু যত্নের নীতিমালা সম্বলিত একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো প্রবর্তন করে। এটা শুধু সরকারের জন্যই প্রযোজ্য নয় বরং আন্তর্জাতিক সংগঠন, শিশু অধিকার বিষয়ক সংগঠন, নাগরিক সমাজ, পেশাদারি এবং স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন উদ্যেগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে শিশুদের যত্নপ্রদানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা এ ব্যাপারে তদারকি করে—তাদের ক্ষেত্রেও এই কাঠামোটি প্রযোজ্য।
শারীরিকভাবে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য দরকার খাদ্য, বস্ত্র এবং একটি নিরাপদ আশ্রয়ের। মানসিকভাবে পূর্ণবিকাশের জন্য পরিবারের বড়দের কাছ থেকে শিশুর স্নেহ ও ভালোবাসার প্রয়োজন। বাংলাদেশে বিকল্প শিশুযত্নের ক্ষেত্রে সরকার নানাবিধ কার্যকরী এবং ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ভাগ্যহীন অসহায় শিশুদের অন্ন, বাসস্থান, প্রাথমিক শিক্ষা, সুচিকিত্সা এবং অন্যান্য চাহিদাসমূহের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন ‘শিশু উন্নয়ন এবং কল্যাণ তহবিল’ নামে বড় ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে সারাদেশে সরকার অনুমোদিত ৯১টি শিশু সেবা সংস্থা শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। এমনই একটি সংস্থা এসওএস আন্তর্জাতিক শিশুপল্লী। এই সংস্থাটি বাংলাদেশে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে পরিবারিক পরিবেশে স্নেহবঞ্চিত শিশুদের যত্নপ্রদানের চমত্কার মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
পর্যাপ্ত নেটওয়ার্কিংয়ের অভাবে এখনো প্রান্তিক ও গ্রামাঞ্চলের মানুষ এসব সেবাদানের ব্যাপারে বেশিকিছু জানে না। সেমিনার, কর্মশালা এবং প্রচারের মধ্য দিয়েই তাদেরকে শিশুসুরক্ষা বিষয়ে সম্যক জ্ঞান দিতে হবে। বঞ্চিত যেসব শিশুরা আত্মীয়ের পরিবারে কিংবা সংস্থায় বেড়ে ওঠে, তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দরকার একটা স্নেহশীল নিরাপদ আশ্রয়স্থল। আর শিশুদের এই বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সংস্থাসমূহের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের সেবা নিশ্চিত করার জন্য আরও কৌশলগত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, যা তাদের জন্য সেবার মানোন্নয়নে ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে শিশুদের আরো অধিকতর কার্যকরী ‘বিকল্প যত্ন’ সুবিধা সুনিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহকে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
লেখক : ডেপুটি ন্যাশনাল ডিরেক্টর, এসওএস আন্তর্জাতিক শিশুপল্লী বাংলাদেশ
