বালিরটেক সেতুর নাম 'শহীদ মিরাজ সেতু' করা দাবি

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৭, ১৬:১১
‘‘ঢাকা-সিঙ্গাইর-হরিরামপুর রুটে দুটি মাঝারি মানের নদী আছে। ঢাকা হতে সিঙ্গাইর প্রবেশের মুখে ধল্লা অংশে নির্মিত সেতুর নামকরণ করা হয়েছে সিঙ্গাইরের কৃতি সন্তান ভাষাসৈনিক শহীদ রফিকের নামানুসারে ‘শহীদ রফিক সেতু’। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সিঙ্গাইর হতে হরিরামপুর প্রবেশের মুখে কালীগঙ্গা নদীতে বালিরটেক অংশে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। হরিরামপুরে প্রবেশের মুখে বালিরটেকে নির্মিতব্য এ সেতুটির নামকরণ করা হোক হরিরামপুরের কৃতিসন্তান, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পোলভল্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মো. মিরাজউদ্দিনের নামানুসারে ‘শহীদ মিরাজ সেতু’।’’
 
তৈয়বুল আজহার নামে ওই এলাকার এক ব্যক্তির ফেসবুক স্ট্যাটাস উপরের অংশটি। তার স্ট্যাটাসের পর এই দাবির পক্ষে কথা বলেছেন ওই এলাকার অনেক বাসিন্দারাও। 
 
আজহার ওই স্ট্যাটাসে আরো লিখেছেন, প্রস্তাবনাটি আমার ব্যক্তিগত। আমার মনে হয়েছে বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-সিঙ্গাইর-হরিরামপুর রুটে চলাচলকারী জনগোষ্ঠীর কাছে একই সাথে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও চেতনা চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। বেউথা সেতুর নামকরণ সংক্রান্ত জটিলতার পুনরাবৃত্তি আমরা বালিরটেকে দেখতে চাই না। গাবতলী থেকে বাসে উঠে হরিরামপুরের পদ্মার পাড় পর্যন্ত যেতে যেতে একজন ভাষা শহীদ এবং একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে স্মরণ করার সুযোগ আমরা কেন মিস করবো!
 
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাটিকান্দা গ্রামে জন্মে ছিলেন মিরাজ। বাবা শরীফ উদ্দিনকে মাত্র ১১ বছর বয়সে হারিয়ে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন তিনি। বিধবা মা মোসাম্মত হাজেরা খাতুন মানুষের মত মানুষ করার জন্য ছেলেকে বড় করে তুলেন। হরিরামপুর উপজেলার লেছরাগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় লেখাপড়া করেন। প্রাইমারি পেরিয়ে হরিরামপুরে পাটগ্রাম অনাথবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করে ভর্তি হন ঢাকার নবকুমার ইন্সটিটিউটে। এরপর জগন্নাথ কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বাধীনতার এতবছর পরও জাতীয়ভাবে তো নয়ই তাঁর জন্মভূমি মানিকগঞ্জেও আলাদা করে খুব একটা তাঁকে স্মরণ করা হয়নি। মানিকগঞ্জ স্টেডিয়ামের নামফলকে শহীদ তপনের সাথে যৌথভাবে আছে তাঁর নাম শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়াম হিসেবে। প্রাপ্তি বলতে ঐটুকুই। 
 
মিরাজের প্রিয় ইভেন্ট ছিল পোলভল্ট, হার্ডলস এবং লং জাম্প। ১৯৬৩ সালে আন্তঃ স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে এ তিনটি ইভেন্টে প্রথম হয়ে ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়নশীপ অর্জন করেছিলেন মিরাজ। ১৯৭০ সালে একই সালে করাচী হকি কাব মাঠে অনুষ্ঠিত ১২তম পাকিস্তান জাতীয় গেমসে তত্কালীণ পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়াদলের পতাকা হাতে মার্চপাস্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাদের সেরা এ্যাথলেট হিসেবে মিরাজকে স্বীকৃতিও দিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের দ্বিতীয় বষের্র ছাত্র মিরাজউদ্দিন ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মুহসিন হলের ক্রীড়া সম্পাদকও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মিরাজ। কিন্তু সে সৌভাগ্য তাঁর হয়নি।
 
২৫ মাচের্র কালো রাত্রি সব কিছু উল্টে দেয়। কালমাত্র বিলম্ব না করে ঢাকা ছেড়ে আসেন হরিরামপুর গ্রামে। গ্রামে বসে সংগঠিত করতে থাকেন তরুণদের সাথে নিজের ছোট ভাই একেএম সিরাজউদ্দিনকেও। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিক। বিধবা মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছোট ভাই সিরাজসহ সোজা মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন হালিমের কাছে হাজির হয়ে যান মিরাজ। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাননি তিনি। পোলভল্টের বাঁশের পোল ধরা হাতে আঁঁকড়ে ধরেন অস্ত্র। একটির পর একটি গেরিলা যুদ্ধ, আসতে থাকে জয়। ২ নভেম্বর ১৯৭১ যুদ্ধজয়ের নেশায় উন্মত্ত মিরাজদের উপর দায়িত্ব পড়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বানিয়াজুরি ব্রিজ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার। রাতের আঁঁধারে শুরু হয় অপারেশন। কিন্তু বিধি বাম। ব্রিজে ডিনামাইট বসাতে গিয়ে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান মিরাজ। তাঁকে চিনতে দেরী হয়নি হানাদারদের। বন্দী মিরাজকে মানিকগঞ্জের ক্যাম্পে না নিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকার আর্মি হেড কোয়ার্টারে। এখানে জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলে নির্মম নির্যাতন। হাজারও নির্যাতনের মুখে মিরাজের কাছ থেকে সহযোদ্ধাদের কোন প্রকৃত খবর বের করতে পারেনি তারা। এরই এক পর্যায়ে আহত মিরাজকে দেখানো হয় পাকিস্তান টেলিভিশনে। পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় দুষ্কৃতি হিসেবে, জোর করে বলানো অনেক কথা। তারপর তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ১৭ ডিসেম্বর স্বাধীনতার আনন্দে উদ্বেল, স্বণর্রাঙা সকালে মিরাজের ভাইসহ পরিবারের সবাই ছুটে যান কেন্দ্রীয় কারাগারে। কিন্তু কারাকর্তৃপক্ষ তাদের কাছে নির্মম সত্যটি জানিয়ে দেন, 'মিরাজ তাদের কাছে নেই। 
 
৮ ডিসেম্বর সকালে আলবদর বাহিনীর ডিরেক্টর মেজর মোস্তাক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মিরাজকে মুক্ত করে পাকবাহিনীর জীপে করে তুলে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে আজও কোন খোঁজ মেলেনি মিরাজের। আলবদর বাহিনী ক্রীড়াঙ্গনের এই নক্ষত্রকে চিনতো বলেই তাকে নিভিয়ে দেবার কথা ভুলেনি। স্বাধীনতার ৪৩ টি বছরেও মিরাজের পরিবার খুঁজে পায়নি তার লাশ, কবরের নেই কোন চিহ্ন।
 
ইত্তেফাক/এএম।