সিলেটে নতুন এলাকা প্লাবিত, দুর্গতির শেষ নেই মানুষের

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৭, ০০:০৭

সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে মোড় নিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬ টায় সিলেটে সুরমা ও কুশিয়ারা বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়। গতকাল নতুন করে জগন্নাথপুর, ছাতক ও সিলেটের আরো নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সিলেটে বানভাসি মানুষের কষ্ট ও দুর্গতির শেষ নেই। পানি বৃদ্ধিতে আরো আউশ ও আমনের বীজতলা ভেসে গেছে।

ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া গতকাল মঙ্গলবার সিলেটের বন্যাকবলিত ফেঞ্চুগঞ্জ, বড়লেখাসহ কয়েকটি এলাকা পারিদর্শন এবং ত্রাণ বিতরণ করেন। এসময় তিনি বন্যার পানি না নামা পর্যন্ত দুর্গত মানুষকে সবরকম সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বলেন, সরকার দুর্গতদের পাশে আছে সব সময়। তিনি বন্যায় গৃহহীন হয়ে পড়া সবাইকে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদও গত দু’দিন থেকে গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার এলাকায় বন্যার্তদের খোঁজ-খবরে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কৃষি বিভাগ জানায়, বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আরো ফসল প্লাবিত হচ্ছে। সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২শ’ হেক্টর জমির ফসল ও ৪৫ হেক্টার আমন বীজতলা তলিয়ে গেছে।

গত ক’দিনের অব্যাহত বৃষ্টির ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত মঙ্গলবারও সিলেটে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। অন্যদিকে উজানের ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যাকবলিত সিলেটের ৯টি উপজেলায় দুর্ভোগ বেড়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায় গতকাল সন্ধ্যায় কানাইঘাটে সুরমা বিপদসীমার ৫৬ সে.মিটার, সুনামগঞ্জে ৯ সে.মিটার এবং অমলসিদে কুশিয়ারা ৮২ সে.মিটার, শেওলায় ৭২ সে.মিটার ও শেরপুরে ১৯ সে.মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। মঙ্গলবার কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর ও ছাতকের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জে পানির চাপ মারাত্মক আকার ধারণ করায় সেখানের পরিস্থিতি করুণ। বাজারের রাস্তায় এখন নৌকা চলে। ফেঞ্চুগঞ্জের ৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮৯টি দুর্গত পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

বন্যার কারণে আউশ ধানের পর তলিয়ে যাচ্ছে আমন ধানের বীজতলা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ আলতাবুর রহমান বলেন, পানিতে তলিয়ে যাওয়া সব ধানই নষ্ট হবে না। তবে যেভাবে পানি বাড়ছে তা দুশ্চিন্তার কারণ।

বন্যাকবলিত অন্তত সাড়ে ৩ লাখ লোক মারাত্মক দুর্গতির মধ্যে পড়েছেন। তারা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। ঘরে নেই খাবার, নেই রান্নার ব্যবস্থা। অসহায় হয়ে পড়েছেন তারা। কোনো কোনো স্থানে বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ পৌঁছলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক স্কুলে বন্যার পানি ওঠায় স্কুল বন্ধ। জেলায় ১৪৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। পানিবন্দি লোকজনের বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণা করেছে। ত্রাণের জন্য বাড়ছে হাহাকার। এ পর্যন্ত ১২৭ টন চাল ও ২ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় হয়েছে এবং বন্টনও শুরু হয়েছে জানান জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তরা। সিলেট জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার জানান, কুশিয়ারা পানি উপচে প্রবেশ করায় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে দুই শতাধিক গ্রামের নিম্নাঞ্চল পানির নীচে অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠছেন। তিনি জানান, পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। দুর্গত মানুষদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, বন্যার পানি না নামা পর্যন্ত দুর্গত এলাকার মানুষজনকে সবরকম সহায়তা করবে সরকার। গৃহহীন হয়ে পড়া সবাইকে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। মঙ্গলবার সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় কয়েকটি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, কুশিয়ারা নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি ও খননে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে উদ্যোগ নেয়া হবে। এসময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট ৩ আসনের সাংসদ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী, ত্রাণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ শাহ কামাল, যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মহসিনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এর আগে মন্ত্রী মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বন্যার্ত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেন।

ইত্তেফাক/নূহু