সুরমায় পানি আরো বেড়েছে দুর্গতদের খাবারের অভাব

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৭, ০১:০৯

বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সিলেটের সুরমা পানির চাপ আরো বেড়েছে। সীমান্তবর্তী কানাইঘাটে গতকাল দুপুরে সুরমার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৭৭ সে.মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে কুশিয়ারা অববাহিকায় নদীর পানি কিছুটা হ্রাস পেলেও সিলেটের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। বন্যাকবলিত সিলেটের বিভিন্ন এলাকা পানিতে ভাসছে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার, দাউদপুর ও জালালপুর ইউনিয়নের ২৪টি গ্রাম ও দেড় লাখ লোক পানিবন্দি। কুশিয়ারা ডাইক ভেঙে যাওয়ার কারণে সেখানকার দেড়শ হেক্টর আউশ তলিয়ে গেছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, শেওলা, শেরপুর ও অমলসীদে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার কিছুটা নিচে নামলেও ভাটির দিকে এখনো গ্রাম, জনপদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট ডুবে আছে। কোনো কোনো স্থানে ত্রাণের জন্য বন্যা দুর্গতরা হাহাকার করছেন।

বন্যার পানি দাঁড়িয়ে থাকায় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। সিলেটের কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ, কোম্পানীগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় বন্যার পানি থৈ-থৈ করছে। ঐসব এলাকার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন গত ক’দিন থেকে। গরু-বাছুর নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। মাঠ-ঘাট ডুবে যাওয়ায় গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়াসহ চর্মরোগ দেখা দিয়েছে বলে এলাকাবাসী জানান। বানভাসি মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন। তারা বন্যার ময়লা পানি দিয়ে থালা বাসন ও পোশাক পরিষ্কার করছে। অসচেতনভাবে ময়লা পানির ব্যবহারে ব্যাপকহারে ডায়রিয়া ও আমাশয় রোগের  বিস্তারের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় কয়েকটি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. হিমাংশু লাল রায়। রোগীদের চিকিত্সা প্রদান করছেন বলে জানান তিনি। তিনি জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় এক লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। আরো প্রায় দেড় লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও এক লাখ ওরস্যালাইন মজুদ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব, রোগ-বালাই দমন ও পানি বিশুদ্ধকরণে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রতি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন কর্মীদের দিয়ে তাদের বাসস্থানের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ফটোসেশন করিয়ে তাদের দায়িত্বের পরিসমাপ্তি ঘটাচ্ছেন।

হতদরিদ্রদের ভাগ্যে শুকনো খাবারও জুটছে না

বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর উপজেলায় প্রায় দুই হাজার হেক্টর আউশ-আমন তলিয়ে গেছে। মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। হতদরিদ্র লোকজনের অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে। মঙ্গলবার রাত থেকে বিপদসীমার উপরে থাকা কুশিয়ারা নদীর পানি কিছুটা কমলেও নদীর পানি প্রবল বেগে হাওরাঞ্চল ও লোকালয়ে প্রবেশ করায় পানিবন্দিদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। বুধবার দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফয়জুল ইসলাম বালাগঞ্জে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আতাউল গনি, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নজরুর রহমান ও ইউএনও প্রদীপ সিংহ, সিলেট-২ আসনের এমপি ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী এহিয়ার ব্যক্তিগত উদ্যোগে উপজেলার পশ্চিম পৈলনপুর ও সাদিপুর ইউনিয়নে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন। সিলেট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরীও একইদিন ওসমানীনগরের উমরপুর ও তাজপুর ইউনিয়নের বন্যার্তদের মধ্যে সরকারি বরাদ্দের ত্রাণের চাল ও সরকারি ত্রাণের চাল থেকে দুই উপজেলার আংশিক এলাকায় কিছু সংখ্যক লোকজনের মধ্যে বিতরণ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ বন্যাদুর্গত মানুষের ভাগ্যে চালতো দূরের কথা শুকনো খাবারও জুটছে না। দুই উপজেলার প্রায় চার লক্ষাধিক বানভাসি মানুষের জন্য সরকারি ভাবে দেয়া যত্সামান্য বরাদ্দ কিছুই না।

সিলেটের বন্যার্তদের জন্য ৫০০ টন চাল এবং ১০ লাখ টাকা এবং দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিলেটের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন আয়োজিত জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিশেষ সভায় এ কথা বলেন। তিনি বলেন, বন্যার পানি না নামা পর্যন্ত বন্যাদুর্গত মানুষদের সবধরনের সহায়তা করা হবে।

সারিয়াকান্দিতে যমুনায় পানি বৃদ্ধিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

বগুড়া অফিস জানায়, গত কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে সারিয়াকান্দির কাছে যমুনার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উপজেলার  চরাঞ্চলসহ  বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলের পাট ও রোপা আমন ধানের ক্ষতি হয়েছে।  উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের রৌহাদহ, চন্দনবাইশা ইউনিয়নের শেখপাড়া, চরঘুঘুমারি, কুতুবপুর ইউনিয়নের কর্ণিবাড়ি, ধলিরকান্দি ও বয়রাকান্দি গ্রামে নতুন করে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। প্রায় এক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বগুড়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমিন জানান, যমুনার পানি বুধবার বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কোথাও কোনো ভাঙন আপাতত দেখা না দিলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে  রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে রামুর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

রামু (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, টানা বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের রামুতে বাঁকখালী নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি, রামু-মরিচ্যা, ঈদগড়-ঈদগাঁও সড়কসহ বেশ কয়েকটি রাস্তা তলিয়ে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। রাস্তা-ঘাটের পানিতে চলাচল সীমিত হয়ে মানুষ কাজকর্মে যেতে না পেরে গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে।

পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বুধবার সকাল থেকে গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, জোয়ারিয়ানালা, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, ঈদগড় ও রাজারকুল ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী বেশ কয়েকটি গ্রাম রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়েছে। রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজ-উল-আলম জানান, ভারী বর্ষণে রামুর ঐতিহ্যবাহী ফকিরা বাজার, গর্জনীয়া বাজার, কাউয়ারখোপ বাজারসহ সাত ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

পানিতে ভাসছে চকরিয়া

চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, অব্যাহত ভারী বর্ষণে ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের জলে ভাসছে চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ। গতকাল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে উপজেলার উপকূলের সাত ইউনিয়ন। বদরখালী, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর, পূর্ববড় ভেওলা, পশ্চিম বড়ভেওলা ও সাহারবিল ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দুর্গতরা রাস্তার ওপর পলিথিনের ঘর তৈরী করে তাতে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে দুর্গত জনপদের মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ও পানীয় জলের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু