গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নাকাল রাজধানীর লাখ লাখ মানুষ। গলি থেকে রাজপথের অধিকাংশই তলিয়ে গেছে বৃষ্টির পানিতে। বৃষ্টির পানির কারণে অনেক স্থানে যানজটেরও সৃষ্টি হয়। এতে করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রী ও পথচারীদের। অনেক স্থানে ১০ ঘণ্টা পরও বৃষ্টির পানি সরেনি। ফলে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এতে করে মানুষের দুর্গতি বেড়েছে।
জলাবদ্ধতার জন্য ভুক্তভোগীরা ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনকে দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, এই তিনটি সংস্থা নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে নগরবাসীর কিছুতেই যেন মুক্তি মিলছে না। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশন বা ঢাকা ওয়াসার কার্যকর কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
এই বিপর্যয়ের জন্য অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নগরীর খালগুলো বেদখল হওয়াকে দায়ী করেছেন নগরবিদরা। এ ছাড়া স্থানীয় লোকজন অতিমাত্রায় খোঁড়াখুঁড়ি, খানাখন্দে ভরা রাস্তা ও ফুটপাতের অব্যবস্থাপনার কথাও উল্লেখ করেছেন। এছাড়া বৃষ্টির পানি সেচের জন্য ঢাকা ওয়াসার প্রায় ২৫০টি পাম্প রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই এই পাম্পগুলো অকেজো থাকে। কারণে বৃষ্টির পানি যথাসময়ে অপসারণ করা সম্ভব হয় না। ফলে অতিরিক্ত পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো প্রতি বছর রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বিপুল অর্থ খরচ করছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় ঢাকা ওয়াসা ড্রেনেজ বিভাগের মাধ্যমে দুই যুগে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ করেছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বিগত পাঁচ বছরেই পানি নিষ্কাশনকার্যক্রম চালাতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। এর বাইরেও এ সময়ে ড্রেনেজ উন্নয়নের ব্যাপক কার্যক্রম চলছে। তারপরও রাজধানীর ২৬টি খাল, তিন হাজার কিলোমিটার ড্রেন ও জলাশয় ভরাট থাকছে আবর্জনায়। বেদখল হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই সড়কে-গলিতে জমছে হাঁটু থেকে কোমর পানি। কিছুতেই জলাবদ্ধতা নিরসন করা যাচ্ছে না।
জলাবদ্ধতার বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, রাজধানীর খালগুলো হারিয়ে যাওয়ায় নগরীতে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রাকৃতিক খালগুলো উদ্ধারের ব্যবস্থা না করা হলে এই জলাবদ্ধতা ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। তিনি জলাবদ্ধতার জন্য ঢাকা ওয়াসাকেও দায়ী করে বলেন, ওয়াসা ড্রেনেজ লাইনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় বৃষ্টির পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা যায়, গত কয়েক দিনে বিশেষ করে গত মঙ্গলবারের বৃষ্টির পরই মতিঝিল, নয়াপল্টন, গুলিস্তান, নাজিমউদ্দিন রোড, আরামবাগ, শান্তিনগর, রাজারবাগ, মালিবাগ, কাকরাইল, কাওরানা বাজার, মিরপুর-১০, বেগম রোকেয়া সরণি, কালশী, মহাখালী, তেজগাঁও, খিলগাঁও, রামপুরা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, উত্তরা বিমানবন্দর মোড়, আশকোনা হাজীক্যাম্প রোডসহ আশাপাশ এলাকা তলিয়ে গেছে।
একই সঙ্গে মিরপুর, বাড্ডা, তেস্তুরী বাজার, কাঁঠালবাগান, নাখালপাড়াসহ বিভিন্ন জায়গায় হাঁটু সমান পানি জমেছে। এতে পথচারী ও যানবাহনের আরোহীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রাস্তার ধারের অনেক বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকে গেছে।
ডেমরা, সায়েদাবাদ, ধোলাইপাড়, আগারগাঁও-মিরপুর-শেওড়াপাড়া, পল্লবী, খিলক্ষেত, কুড়িল, উত্তরা, মুগদা, সবুজবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, দক্ষিণখান, ভাটারা, ভাসানটেক এলাকার কোথাও কোথাও বৃষ্টির কারণে হাঁটু পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
অনেক এলাকার প্রধান রাস্তাসহ শাখা রাস্তা, অলিগলি হাঁটু পানিতে নিমজ্জিত। ড্রেন-ডাস্টবিন, নর্দমার ময়লার সঙ্গে বৃষ্টির পানি মিশে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতায় রাস্তা ডুবে অনেক এলাকার মানুষ দৃশ্যত পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। খুব প্রয়োজন না হলে কেউ বের হচ্ছেন না। বৃষ্টি হলেই রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার রাস্তা চলাচলের উপযোগী থাকে না। অনেক স্থানে রাস্তা ও ফুটপাথের ওপর দিয়ে ড্রেনের ময়লা ও বৃষ্টির পানি থৈ থৈ করছে। বৃষ্টির পানি লোকজনের বাসাবাড়ি, দোকানপাট এবং অফিস চত্বরে ঢুকে পড়েছে।
এলাকাবাসী জানান, বৃষ্টিতে আটকে পড়া লোকজন ময়লা পানির মধ্যেই জামা-কাপড় ভিজিয়ে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অফিস-আদালতের লোকজনসহ লাখ লাখ নগরবাসী এভাবে চমর দুর্ভোগে পড়েন।
ঢাকা ওয়াসার সাবেক কর্মকর্তা প্রকৌশলী আমিনুর রহমান বলেন, বৃষ্টির পানি অপসারণের জন্য ঢাকা ওয়াসার প্রায় ২৫০টি পাম্প রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই এই পাম্পগুলো অকেজো থাকে। যে কারণে বৃষ্টির পানি যথাসময়ে পাম্প করা সম্ভব হয় না। ফলে অতিরিক্ত পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে করে মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যায়। অথচ এই পাম্পগুলোর খরচ হিসেবে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার ভাউচার তৈরি করা হয়।
পুরান ঢাকার বকশী বাজারের ব্যবসায়ী হাজী ইনসান আলী বলেন, গলিপথের রাস্তাও ময়লা পানিতে একাকার হয়ে গেছে। সহজে বোঝার উপায় নেই- কোথায় গর্ত আর কোথায় গর্ত নেই। পুরো রাস্তা, গলিপথ ও ফুটপাথ পানিতে তলিয়ে গেছে। পানির মধ্যে দিয়ে চলতে গিয়ে অনেক গাড়ি বিকল হয়ে যায়। এ ছাড়া পানির মধ্য দিয়ে ধীরগতিতে চলতে গিয়ে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজটের।
অধ্যাপক ড.আইনুন নিশাত বলেন, ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতা, অপরিকল্পিত, অদূরদর্শী কার্যক্রম এবং নগরবাসীর অসচেতনতার কারণে এত খরচের সুফল মিলছে না। জনসচেতনতার ঘাটতি বড় সমস্যা হলেও এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, রাজধানীর ২৬টি খাল কোনোভাবেই উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কারণ খালগুলো ভরাট করে বাসাবাড়ি করে ফেলা হয়েছে। তা ছাড়া এ খাল উদ্ধারে সিটি করপোরেশনের করণীয় কিছু নেই। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ড্রেন নির্মাণ, পরিষ্কার এবং সাকার মেশিন দিয়ে ড্রেনের কঠিন বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. সাঈদ খোকন বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। কিন্তু তারা সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না। জলাবদ্ধতা যেসব কারণে সৃষ্টি হচ্ছে সেসব কারণগুলো শনাক্ত করা হচ্ছে। এরপর জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া নগরবাসীকে সচেতন করতে নানা সভা-সেমিনারের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। যাতে মানুষ ড্রেনলাইনগুলোতে ময়লা আবর্জনা না ফেলে। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতিমধ্যেই , শান্তিনগর,নাজিমউদ্দিন রোড ,মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকায় ড্রেন নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
নগরবিদ অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, একটি আধুনিক নগরে দু’ধরনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকা চাই-একটি বৃষ্টি ও গৃহস্থালির পানি নিষ্কাশনের জন্য, অন্যটি পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের। কিন্তু ঢাকাসহ প্রধান নগরগুলোতে সে ব্যবস্থা নেই।
ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, শুধু বর্ষা নয়, যেকোনো সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হলে কিছু সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবেই। কারণ বর্তমানে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার পক্ষে ১০ থেকে ২০ মিলিমিটার বেশি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব নয়। গত মঙ্গলবার ঢাকায় ২৪ ঘণ্টায় ১০৩ মিলিমিটারের বৃষ্টিপাত হয়েছে। তিনি জলজটের জন্য খাল দখল হয়ে যাওয়া, নদীগুলো খনন না করাসহ সিটি করপোরেশন ও রাজউকের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডকেও দায়ী করেন। তিনি অবিলম্বে নগরীর মধ্যদিয়ে প্রবাহমান খালগুলো উদ্ধার ও তা সংরক্ষণ করার প্রতি গুরুত্ব দেন।
ইত্তেফাক/নূহু
