বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণীকে ধর্ষণ করার সময় সকলেই মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। মদ্যপ অবস্থায় সাফাতের সঙ্গে এক তরুণীর এবং নাঈম আশরাফ ওরফে হাসান মো. আব্দুল হালিমের সঙ্গে আরেক তরুণীর শারীরিক সম্পর্ক হয়। পরে সাফাত ওই তরুণীকে পিল সেবন করান। এই শারীরিক সম্পর্কের একদিন পর তরুণী ঘটনাটি মেনে নেয়নি বলে তাদের বন্ধু সাদমান সাকিফকে ম্যাসেঞ্জারে জানিয়ে দেন। ২/৩ দিন পর বিষয়টি মীমাংসার কথা বলে উত্তরায় আপন জুয়েলার্সের একটি শোরুম থেকে ২ লাখ টাকার দুইটি স্বর্ণের ব্রেসলেট নেন ওই দুই তরুণীর তিন বন্ধু। এছাড়া জন্মদিনের অনুষ্ঠানটি ওই দুই তরুণীর পরামর্শে রেইনট্রিতে করার উদ্যোগ নেন সাফাত। এমন সব তথ্য বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণীকে আটকে রেখে ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে সাফাত আহমেদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।
গত ১৮ মে ঢাকা মহানগর হাকিম আহসান হাবিবের আদালতের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে সাফাত বলেন, ১৮ মার্চ অথবা ১৯ মার্চ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার গুলশান লিংক রোডে অবস্থিত পিকাসো রেস্টুরেন্টে ওই তরুণীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারা মদপানও করেন। অল্প সময়ের মধ্যে ওই তরুণীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এরপর তারা বেশ কয়েকদিন এক সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে। সারারাত মোবাইল ফোনে কথোপকথনও হয়।
জবানবন্দিতে বলা হয়, ২৮ মার্চ সাফাতের জন্মদিন। এটি কোন সাজানো তারিখ নয়। জন্মদিনের অনুষ্ঠান কীভাবে সেলিব্রেট করা যায়-এ নিয়ে কথা বললে ওই তরুণী তাকে জানায় যে সুইমিং পুল রয়েছে-এমন রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠান করলে ভালো হয়। সে অনুযায়ী বনানীর রেইনট্রিতে জন্মদিন পালনের সিদ্ধান্ত নেয় সাফাত। তার বন্ধু মাহির হারুনকে রেইনট্রিতে রুম বুকিং করার কথা জানানো হয়।
২৮ মার্চ সন্ধ্যা ৭ টার দিকে নাঈম তার দুই বান্ধবীকে নিয়ে রেইনট্রিতে আসেন। রাতে সাড়ে ৮ টার দিকে সাফাতের গাড়িতে করে ওই তরুণী রেইনট্রিতে আসে। এর কিছু সময় পর তরুণীর বন্ধু ডা. শাহরিয়ার, তার গার্লফ্রেন্ড স্নেহা আসেন। তারা সবাই প্রেসিডেন্ট স্যুটে মদ পান করেন। এরপর হোটেলের ছাদে সুইমিং পুলে যান তারা। সুইমিং পুলে সাফাত, দুই তরুণী ও ডা. শাহরিয়ার সাঁতার কাটেন। বাকিরা সুইমিং পুলের পাশে টেবিলে বসে ছিলেন। ওই তরুণী তার ব্যাগে করে সুইম করার পোশাক নিয়ে এসেছিলেন।
জবানবন্দিতে আরো বলা হয়, দুই ঘণ্টা সুইমিং করার পর তারা পোশাক পরিবর্তন করে জন্মদিনের কেক কাটেন। পরে তারা হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুটের ড্রইং রুমে যান। সেখানে সবাই একত্রিত হয়ে মদপান করতে থাকেন। নাঈম আশরাফ দুই অভিযোগকারীর একজনকে বেশি করে মদ পান করান। তারা খুব ক্লোজ (ঘনিষ্ঠ) হওয়ার চেষ্টা করে। সকলেই এতই মদপান করে যে সবাই বেসামাল হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর ডা. শাহরিয়ার তার গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ৭০১ নম্বর রুমে চলে যায়। নাঈম দুই অভিযোগকারীর এক তরুণীকে টেনে নিয়ে প্রেসিডেন্ট স্যুটের কক্ষে চলে যায়। সাফাত ও অপর তরুণী মদ খেয়ে নাচানাচি করতে থাকেন। এক পর্যায়ে সাফাত তরুণীকে জড়িয়ে ধরেন। ড্রইং রুমের সোফার ওপর দুই জন শুয়ে পড়েন।
সাফাত তার জবানবন্দীতে বলেন, ‘অতিরিক্ত মদপানের কারণে ওই তরুণীর শরীরের কোন শক্তি ছিল না। দুই জন মিলে শারীরিক সম্পর্ক করি। প্রেসিডেন্ট স্যুটের ড্রইং রুম তখন অন্ধকার ছিল। তার সাথে দৈহিক সম্পর্ক করবো-এটা পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না। উত্তেজনার বশে দুই জন করে ফেলেছি। আনুমানিক রাত সাড়ে ১১ টার দিকে অন্ধকারের মধ্যে আমরা দুই জনই কাপড় পরিধান করি। এরই মধ্যে কলিং বেলের শব্দ পেয়ে দরজা খুলে ওয়েটারের কাছ থেকে রাতের খাবার রিসিভ করি। খাবার ডাইনিং টেবিলে রাখার জন্য ঘরের লাইট জ্বালাতে ঐ তরুণী হতভম্ব হয়ে যায়। আমাদের মধ্যে যে দৈহিক সম্পর্ক হয়েছে-সেটা সে হয়তো পছন্দ করেনি। তরুণী রুমের দরজা খুলে পাশের ৭০১ নম্বর কক্ষে চলে যায়। তখন আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না। কারণ ওই তরুণীর সঙ্গে আমার আনপ্রোটেকটেড দৈহিক সম্পর্ক হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে বিপদ হতে পারে ভেবে বন্ধু সাদমান সাকিফকে ফোন করে বিষয়টি জানায়।’
ঘটনার পর সাফাত তার গাড়ি চালক বিল্লালকে মোবাইল ফোন করে জন্মনিরোধ পিল কিনে আনার নির্দেশ দেয়। এরপর বিষয়টি নাঈমকে জানায়। নাঈম তখন শাহরিয়ারকে প্রেসিডেন্ট স্যুট থেকে ডেকে নিয়ে মারপিট করতে থাকে। শাহরিয়ারের কাছ থেকে তার গাড়ি চাবি নাঈম কেড়ে নেয়। মারপিটের দৃশ্য সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল মোবাইল ফোনে ভিডিও করে। ওই তরুণী তখন মারপিট না করার অনুরোধ করে। এসময় আরেক তরুণী কাঁদতে কাঁদতে ওই রুমে প্রবেশ করে। তরুণী জানায় যে, নাঈম তার সাথে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক করেছে। এসময় নাঈম জোর করে তরুণীকে পিল খেতে বাধ্য করে। পরদিন সকাল ৮ টার দিকে নাঈম গাড়ির চাবি শাহরিয়ারের কাছে ফেরত দেয়। শাহরিয়ার তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে হোটেল থেকে চলে। সকাল ৯ টার দিকে উবারের মাধ্যমে একটি গাড়ি ভাড়া করা হয়। ঐ গাড়িতে করে সে, নাঈম ও দুই তরুণী রওনা দেয়। দুই তরুণীর বাসার সামনের রাস্তায় সাফাত ও নাঈম গাড়ি থেকে নেমে যায়। তারা তাদের বাসায় চলে যায়। পরদিন সাদমান সাকিফকে তরুণী ম্যাসেঞ্জারে জানায় যে তারা এই শারীরিক সম্পর্ক মেনে নেয়নি। তারা আইনের দ্বারস্থ হবেন। এরপর সে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করে।
জবানবন্দিতে আরো বলা হয়, ওই তরুণী তার মোবাইল ফোন, ফেসবুক ও ম্যাসেঞ্জার বন্ধ করে দেয়। ২/৩ দিন পর সৌরভ তাকে ফোন করে মীমাংসা করার কথা বলে। ঘটনার ২/৩ দিন পর সৌরভ, পাপ্পু ও নাদিম তাদের উত্তরায় আপন জুয়েলার্সের শোরুমে গিয়ে ২ লাখ টাকার ২ টি ব্রেসলেট নেয়। ওই দিন পিকাসো রেস্টুরেন্টে গিয়ে ওই দুই তরুণীকে ‘সরি’ বলে সাফাত। ওই দিনই রেস্টুরেন্টে শাহরিয়ারকে মারপিট করার ভিডিও ফুটেজ ডিলিট করে দেয়া হয়।
ইত্তেফাক/এমআর
