চলনবিলে ৩০ বছরে মাছ উৎপাদন হ্রাস ৬৩ শতাংশ

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৭, ১৩:২৯
৩০ বছরে মাছের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৬৩ শতাংশ। আর ২৫টিরও বেশি প্রজাতির মাছ চিরোতরে বিলুপ্ত হয়েছে। আশঙ্কাজনক হারে মাছের উৎপাদন হ্রাস ও বিলুপ্তির ফলে চলনবিল এলাকার হাট-বাজারগুলো প্রায় মাছ শূন্য হয়ে পড়েছে। চলনবিল জুড়ে দেখা দিয়েছে মাছের আকাল।
 
খাল-বিল জলাশয়, নদী-নালা দখল-দূষণে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। কমছে পানির গভীরতা। অপরিকল্পিতভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের ফলে দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রভাব। মাছের অভায়াশ্রমগুলোতে বেড়েছে কীট-নাশকের ব্যবহার। তাছাড়া অবৈধ উপায়ে মা মাছ-ছোট মাছ আহরণের ফলে মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। বিলুপ্তি হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। এতে বর্ষা মওসুমেও মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। নাটোর জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
 
জানা গেছে, বিলুপ্তির পথে রয়েছে নান্দিনা, ভাঙ্গন, ঘোড়া, মহাশোল, তিলাশোল, ভ্যাদা, হজার, রেণুয়া, সরপুটি, রিঠা, বাছা, দেশি পাঙ্গাস, আইড়সহ প্রভিতি মাছ। প্রচলিত এসব মাছেরও খুব একটা দেখা মেলেনা চলনবিলের হাট-বাজারে। উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন কমায় এক শ্রেণির অসাধু চাষীরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপদিত মাছের বেশির ভাগই চাষ করছেন বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্য খাইয়ে। ফলে এসব মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহল করায় মানুষ চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। 
    
চলনবিলের ইতি কথা ও ইম্পেরিয়েল গেজেট অব ইন্ডিয়া বই থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের বৃহৎ এই বিলের আয়তন ছিল ৭৩ হাজার ৫শ হেক্টর। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট নানা সমস্যার কারণে বিলের আয়তন কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার হেক্টরে। এরমধ্যে চলনবিল অঞ্চলে ১৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, ৪২৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ৩১টি নদী এবং ১২০ বর্গ কি.মি. আয়তন বিশিষ্ট ৩৭টি খাল রয়েছে। এরমধ্যে প্রধান নদী ৯টি, ২০টি খালসহ ছোট ছোট বিভিন্ন বিল ও খাল রয়েছে। অতীতে ২৩ হাজারের মত বড় বড় পানির আধার ছিল। যা বেশীর ভাগই বেদখলকৃত ও হাত ছাড়া হয়ে গেছে।IMG0
 
চলনবিলের নদী ও খাল
 
নদীগুলোর মধ্যে আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, গুড়, করতোয়া, বড়াল, তুলসি চেঁচিয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা ইত্যাদি। ১৮টি খালের মধ্যে নবীরহাজির জোলা, হকসাহেবের খাল, নিমাইচড়াখাল, বেশানীরখাল, গুমানীখাল, উলিপুরখাল, সাঙ্গুয়াখাল, দোবিলাখাল, কিশোরখালির খাল, বেহুলারখাড়ি, বাকইখাড়া, গোহালখাড়া, গাড়াবাড়ি খাল, কুমারভাঙ্গাখাল, জানিগাছার জোলা, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর।
বাংলাদেশ সরকারের চলনবিল মৎস্য প্রকল্প থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী- ১৯৮২ হতে ২০০৬ সালের মধ্যে এক সমীক্ষায় দেখা যায় ১৯৮২ সালে মোট ১,৭৭,০৬১ জেলে এসব নদ-নদী ও খাল জলাশয়ে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। পর্যায়ক্রমে কমতে কমতে ২০০৬ সালে এর সংখ্যা ৭৫,০০০ জনে দাঁড়ায়। 
 
ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফারাক্কার বাঁধ বিরুপ প্রভাব ফেলে। ৮০’র দশকে পদ্মার উৎস মুখে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদ-নদী ও বিল, জলাশয়, খালগুলোতে পলি জমে ক্রমশঃ ভারাট হয়ে গেছে। বিলের মাঝ দিয়ে যথেচ্ছা ভাবে সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, নদী দখল করে বসতি, দোকান পাট স্থাপন করায় নদীগুলোতে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি বিঘ্নিত হয়েছে। এতে মাছের স্বাভাবিক চলাচল, প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র নষ্ট হয়। সে সময় উচ্চ ফলনশীল ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে চলনবিলে প্রায় ৭হাজার যন্ত্র চালিত নলকূপ বসানো হয়। এতে পানির স্তর নিচে নেমে স্থায়ীত্ব কমে আসে। ফসলি জমিতে রাসায়নিক সার-কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি সরাসরি বাধাগ্রস্ত হয়।
 
তাছাড়া কারেন্ট, বাদাই, সোঁতিসহ বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে প্রজননকালীন সময়ে মাছ ধরা এবং এসময়ে গরিব মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মস্থানের ব্যবস্থা না করা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের প্রভাব, জেলেদের অজ্ঞতা, জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণসহ প্রভৃতি কারণে চলনবিল অঞ্চলে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে। 
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানি ড. মো. রেদওয়ানুর রহমানের প্রবন্ধ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ৩০ বছর আগেও চলনবিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীতে বছর জুড়েই ৬-১২ ফুট পানি থাকত। ফলে বছর জুড়েই নৌচলাচল করত। জেলে, মৎস্যজীবীরা মাছ ধরে জিবীকা নির্বহা করত। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে এসব নদী ভরাট হয়ে গেছে। পরিসংখ্যান মতে, প্রতি বছর ২২২১/২  মিলিয়ন ঘনফুট পলি প্রবেশ করে, ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বর্ষায় চলনবিল ত্যাগ করে। অবশিষ্ট ১৬৯১/২  মিলিয়ন ঘনফুট পলি নদ-নদীসহ চলনবিলে স্থিতি থাকায় ক্রমেই পলি জমে খাল-বিল, নদী-নালা সংকুচিত হচ্ছে। ফলে পানির অভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে মাছ।
 
নাটোর জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, চলনবিলের অন্যন্য অঞ্চলের তুলনায় নাটোরে আবার মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি হচ্ছে। জেলার ১৮হাজার মৎস্যচাষী আধুনিক পদ্ধতিতে মাছের চাষ করছেন। গত বছর জেলায় মাছের মোট চাহিদা ছিল ২৭ হাজার ১৫০টন। প্রেক্ষিতে উৎপাদন হয়েছে ৩৩হাজার ৮৮৬টন। তবে নানা সমস্যার কারনে উৎপাদন আশানুরুপ হচ্ছেনা। মৎস্য অধিদপ্তরে দক্ষ জনবল সংকট থাকা স্বত্বেও অপ্রতুল্য বাজেট। 
 
এছাড়া মৎস্যচাষী ও মৎস্যজীবীদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়না। এসব কারণে বাণিজ্যক ভিত্তিতে মাছ চাষের উপর আগ্রহ হারাচ্ছে চাষীরা। ফলে কমছে উৎপদন।
 
নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা  মো. আতাউর রহমান খান জানান, নদী খাল-বিল-জলাশয়ের ব্যবস্থাপনা ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে মৎস্য মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর, উন্মুক্ত জলাশয়ের দশ শতাংশ অভয়াশ্রম হিসেবে ব্যবহার করলে মাছের উৎপদন কয়েকগুণ বাড়বে। 
 
ইত্তেফাক/এমআই