মো. মাহবুব হাসান শাহীন
একসময় গ্রামে যানবাহন বলতে ছিল রিকশা, গরুর গাড়ি আর বাইসাইকেল। বাইসাইকেল ছিল ব্যক্তিগত বাহন। সবার ঘরে ছিল না। সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারেই ছিল। অবশ্য কেউ কেউ ভাড়ায় ব্যবহার করত বাইসাইকেল। দিন বদলের পালায় গ্রামের চিত্র পাল্টে গেছে। গ্রামজীবনে প্রবেশ করেছে মটর-বাইক, দামি ব্রান্ডের চার চাকার গাড়ি। তবে একথাও ঠিক, আজকের বাস্তবতায় বাইসাইকেল গ্রাম নগর নির্বিশেষে অনিবার্য বাহন হতে পারে।
আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা। আমি গ্রামের স্কুলে পড়ি। তখন গ্রামে পত্র-পত্রিকা কিংবা টেলিভিশনের দুষপ্রাপ্যতা ছিল। আমি আমার শহরের এক আত্মীয়ের বাসায় টেলিভিশনে বাইসাইকেলের ওপর একটি প্রতিবেদন দেখি। প্রতিবেদনটি ছিল চীনের বেইজিং শহরে জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের জন্য বাইসাইকেলের ব্যবহারের ওপর। বিষয়টি যখন আমার সহপাঠীদের বললাম, তখন তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলল—উন্নত দেশে তারা কি বাইসাইকেল ব্যবহার করবে, তারা তো গাড়ি ব্যবহার করবে। তারা আমার কথা বিশ্বাসই করতে চাইল না। যা কষ্টকর ছিল আমার জন্য।
বিশ্বব্যাপী বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা এবং এর ব্যবহার যে দিন দিন বাড়ছে তা অনস্বীকার্য। নেদারল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিলাসবহুল গাড়ির পরিবর্তে বাইসাইকেলে চড়ে অফিস করেন—এটি অনেকেই কাছে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য।
উন্নত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ত শহরে বাইসাইকেলের জন্য পৃথক লেন রয়েছে। আনন্দদায়ক এবং উপভোগ্য ভ্রমণের জন্য বাইসাইকেলের জুড়ি নেই। এটি একাধারে পরিবেশবান্ধব, দূষণমুক্ত, শরীরের জন্য উপকারী এবং চলাফেরার জন্য অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এবং জ্বালানিবিহীন বাহন। পরিবারে দ্বিতীয় আরেকটি গাড়ির চাইতে একটি বাইসাইকেল অনেক ভালো এবং কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নিয়মিত বাইসাইকেল চালনা শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার খুবই ভালো ব্যবস্থা। বাইসাইকেলে ভ্রমণ করে এটি নির্দিষ্ট জায়গায় পার্কিং করা সহজতর। শহর এলাকায় বিশেষত ঢাকার মতো শহরে বাইসাইকেল গাড়ির চাইতে অনেক সময় দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। এটির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক সাশ্রয়ী। যাঁরা গাড়ি চালনার দক্ষতা কিংবা সামর্থ্য অর্জন করতে পারেননি তাঁদের জন্য এটি একটি কার্যকর বাহন হতে পারে।
উন্নত দেশগুলোতে বাইসাইকেল রাখার জন্য পার্কিংয়ের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। সাইকেলপার্কিং স্থানগুলোর পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে বিশেষত শহরাঞ্চলে, সেখানে বাইসাইকেল পার্কিংস্থান রাস্তার পাশে রাখা হয়। একসঙ্গে অল্প জায়গায় অনেকগুলো সাইকেল রাখার ব্যবস্থা থাকে। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সাইকেল ভাড়া নেওয়া যায় এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর পর পার্কিংসপটে সাইকেল রেখে যাওয়া যায়। এরকম ব্যবস্থা আমাদের দেশে বড় শহরগুলোতে প্রচলন করা গেলে তা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং এর মাধ্যমে এক বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
আমার কৈশোরে দেখা প্রতিবেদনের বাস্তবতা আজকের উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে ব্যবহারিক জীবনে স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগ হচ্ছে। আমাদের দেশেও হয়তো একদিন হবে। হয়তো একদিন আমাদের দেশেও সময়ের দাবি হয়ে যাবে পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যসুখকর এই বাইসাইকেল। এভাবেই ঢাকা হবে যানজটমুক্ত এবং দূষণমুক্ত।
ঢাকা
