এজেন্সির স্বেচ্ছাচারিতায় ভোগান্তিতে হজযাত্রীরা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৭, ২৩:৪৫

বজলুর রহমানের বাড়ি মিরসরাই উপজেলার সাহেদখালী গ্রামে। সোনালী ব্যাংকের এই কর্মকর্তা অবসর নিয়েছেন বছরখানেক আগে। স্ত্রী জানাতুল কাওছার এবং মেয়ে আছিয়া রওশন জান্নাতকে নিয়ে হজ করতে যাবেন তিনি। এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে ‘সোয়াদাহে বদল হজ কাফেলা’ নামক এজেন্সিতে গত বছর ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা জমা দেন। পরে ওই এজেন্সি জানায়, তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেছে। ওই এজেন্সি চলতি বছর এই তিনজনকে ‘আল ইমাম হজ কাফেলা ট্রাভেলস অ্যান্ড টুরস’ নামক এজেন্সিতে হস্তান্তর করে। এখানে এসে আরো ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জমা দেন। তবে সংকট যেন তাদের পিছু ছাড়ছে না। এবার বজলুর রহমান এবং তার স্ত্রীর নিবন্ধন হলেও বাতিল হয়েছে মেয়ের নিবন্ধন। ৩০ জুলাই স্বামী-স্ত্রীর ফ্লাইট থাকলেও মেয়েকে ছাড়া যাবেন না বলে ফ্লাইট বাতিল করেছেন এই দম্পতি। হজ অফিসের পরিচালকের কাছে আবেদন করেছেন। তবে কবে এই সমস্যার সমাধান হবে জানা নেই। হজ অফিস কিংবা এজেন্সি কেউ তাদেরকে নিশ্চিত করতে পারছে না।

হজ ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, ক্যাম্পের নিচতলায় দুই বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা নিয়ে এখানে সেখানে ঘুরাঘুরি করছেন। কথা হয় চট্টগ্রামের পাঠানটুলির রহিম উদ্দিন ও তার স্ত্রী কুলসুম বেগমের সঙ্গে। হজে যাওয়ার জন্য এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আল ফাহাদ হজ এজেন্সির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। চারদিন আগে ক্যাম্পে এসেছেন। কিন্তু তাদের ভিসা না হওয়ায় মোয়াল্লেম দুজনকে ফেলে অন্যদের নিয়ে সৌদি আরবে গেছেন। রহিম উদ্দিনের মতো আরও অনেকে এমন সমস্যা নিয়ে অবস্থান করছেন হজ ক্যাম্পে। রহিম উদ্দিন বলেন, এখন আমরা  কি করব বুঝতে পারছি না। মোয়াল্লেম প্রতিনিধিকেও খুঁজে পাচ্ছি না।

খুলনার খালিশপুর থেকে হজ ক্যাম্পে এসেছেন আফসার আলী ও আহসান আলী। এজেন্সিকে জনপ্রতি ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন। এজেন্সি মালিক বিভিন্ন খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা বলে দুই দফায় আরও ১৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। হজ ক্যাম্পে আসার পর আরও ১০ হাজার টাকা দিতে বলেছেন। আফসার আলী বলেন, টাকা দেওয়ার কথা আগে বলেনি।

ফরিদপুরের হজযাত্রী মনির হোসেন ও দুলাল মিয়া অভিযোগ করে বলেন, হজ ক্যাম্পে হজ সংক্রান্ত তথ্যাদি জানতে গিয়ে সেবা কেন্দ্র থেকে ফেরত এসেছেন। জামালপুর জেলার মেলান্দহ থেকে হাবিবুর রহমান এবং তার ভাই ও ভাবী এক সঙ্গে হজে যেতে ক্যাম্পে এসেছেন। কিন্তু মোয়াল্লেম শুধু হাবিবুর রহমানের ভিসা করতে পেরেছেন। সেখানে উপস্থিত হজ এজেন্সির মোয়াল্লেম ফখরুল ইসলাম বলেন, রিপ্লেসমেন্টের কারণে চারজনের ভিসা এখনো করতে পারেননি। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে তাদের ভিসা হতে পারে।

জানা যায়, প্রতিবছর হজ পালনের জন্য সৌদি আরব গমন করেন বিশ্বের প্রায় ১৭২টি দেশের ২৫ থেকে ৩০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। এদিকে ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে হজ করেছেন এমন ব্যক্তিদের ২০১৭ সালে হজ পালন করতে হলে ভিসা আবেদনপত্রের সঙ্গে ২ হাজার সৌদি রিয়াল (বাংলাদেশি ৪৫ হাজার টাকা) জমা দিতে হবে। অন্যথায় ভিসা ইস্যু হবে না। রাজকীয় সৌদি সরকারের এ নিয়মের বেড়াজালে বাংলাদেশি ২০ হাজার ব্যক্তির হজ পালন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। এই নিয়ম চালুর কারণে হজ ভিসা ইস্যু নিয়েও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।

হজ ফ্লাইট নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। হজ এজেন্সিগুলো তাদের আবেদন করা ভিসা না পাওয়ায় ফ্লাইটের টিকিট সংগ্রহ করছেন না। এর ফলে পর্যাপ্ত হজ যাত্রী না পাওয়ায় হজ ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। হজ এজেন্সি মালিকরা জানিয়েছেন, সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার আলাপ-আলোচনা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টির সমাধান না করলে পরিস্থিতি ভয়ানক আকার ধারণ করবে। একের পর এক ফাইট বাতিল হলে শেষ মুহূর্তে হজযাত্রী পরিবহন নিয়ে চরম সংকট তৈরি হবে।

২০১৭ সালের জন্য সরকার যে হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, হজযাত্রীরা ওই প্যাকেজ অনুযায়ী এজেন্সি মালিকদের কাছে হজের টাকা জমা দেন। এ বছর হজ ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে ৬৩৫টি এজেন্সি। এসব এজেন্সির মালিক হজযাত্রীর সৌদি আরবে বাড়িভাড়া, খাওয়া খরচ ও মোয়াল্লেম ফি বাবদ যে অর্থ লাগবে তা ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বরের (আইবিএএন) মাধ্যমে সৌদি আরব পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর এজেন্সি মালিকরা তাদের হজযাত্রীর নামে ভিসার জন্য ই-হজ সিস্টেমে লজমেন্ট করেছে।

কিন্তু ভিসা ইস্যুর সময় দেখা যায়, একটি হজ এজেন্সি যত হজযাত্রীর ভিসার জন্য লজমেন্ট করেছে, ততজন হজযাত্রীর নামে ভিসা হয়নি। কারণ যারা ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে হজ করেছেন, তাদের ভিসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২ হাজার রিয়াল চায় রাজকীয় সৌদি সরকার। এখন ওই পরিমাণ টাকা তো হজ এজেন্সির আইবিএএনে জমা নেই। ফলে ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের হজ পালনকারীদের নামে ২০১৭ সালে হজ ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে না। সৌদি সরকার হঠাত্ করে এই নিয়ম চালু করায় বিপাকে পড়েছে এজেন্সি মালিক ও প্রায় ২০ হাজার হজযাত্রী। এজেন্সি মালিকরা তার সব হজযাত্রীর নামে ভিসা না হওয়ায় বিমানের টিকিট সংগ্রহ করছে না।

হজ অফিসের পরিচালক উপ-সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০১৭ সালে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ বাংলাদেশি হজ পালনের জন্য সৌদি আরব যাবেন। এর মধ্যে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার হজযাত্রীর ভিসা ইস্যু হয়েছে। ভিসাপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ২৪ হাজার জন সৌদি আরব গেছেন।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার সৌদি আরব গেছেন গেছেন প্রায় ৪ হাজার হজযাত্রী। প্রতিদিন হজযাত্রী বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে খুব একটা সমস্যা হবে না। তবুও সংকট তৈরি হলে বিমান বাংলাদেশ ও সৌদি এয়ারলাইন্সের সিডিউল ফ্লাইট এবং বাড়তি ফ্লাইট দিয়ে সমস্যার সমাধান করা হবে।

তিনি আরো বলেন, নিবন্ধিত এজেন্সির মাধ্যমে এবার হজে যাবে ১ লাখ ২২ হাজার জন। অন্যদিকে এবার এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে হজে গেছে ৪ হাজার ২০০ জন। সৌদি অ্যাম্বাসি ভিসার বিষয়ে আন্তরিকভাবে সহায়তা করছে বলে জানান তিনি।

এদিকে গতকাল হজযাত্রীদের খোঁজখবর নিতে হজ ক্যাম্পে যান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। এ সময় তিনি হজযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনে সমাধানের নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্টদের।

ইত্তেফাক/নূহু