গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টি নামে ঢাকায়। মাত্র ৩ ঘণ্টায় ১২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বৃষ্টির পানি খুব বেশি না হলেও তাতেই আবার ভেসে যায় ঢাকা। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। আর এ পরিস্থিতির জন্য মূলত ঢাকার পানি নিষ্কাশনে অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থাকেই দায়ী করলেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার চারদিক শুধু পানি আর পানি। সচিবালয় থেকে রাজপথ আর গলিপথ পানিতে একাকার। সর্বত্রই তিন থেকে চার মাস পূর্বে খুঁড়ে রাখা ড্রেনগুলো পরিপূর্ণ হয়ে আছে ইট, বালু, সিমেন্ট আর ময়লা-আবর্জনায়। ফলে এই অল্প বৃষ্টিতেই ডুবন্ত ঢাকায় নাগরিক জীবনে নেমে আসে অসহনীয় দুর্ভোগ। অসংখ্য যানবাহন রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে। নিরুপায় যাত্রীরা পানির মধ্যে হেঁটে হেঁটে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অসহনীয় যানজটের কবলে পড়ে পানির মধ্যেই দীর্ঘসময় অতিবাহিত করতে হয় নগরের অসংখ্য বাসিন্দাকে।
স্কুলগামী, স্কুলফেরত শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়েন অভিভাবকরা। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কোমড় পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে সবাইকে। কী নারী, কী পুরুষ, কী শিশু সবার একই পরিণতি। দুই একটি জায়গায় নৌকা দিয়ে পারাপার করতে দেখা গেছে। অনেকের এক ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে পাঁচ ঘণ্টা লেগেছে। শান্তিনগরে বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া সড়কে রেসকিউ বোট দিয়ে পারাপার করিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
এই জলজট সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার বিষয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এছাড়া আগামী সোমবার ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে ডেকেছি। সমস্যার বিষয়ে কথা বলে করণীয় ঠিক করবো।IMG0
কেন এই জলজট:ঢাকা শহরে দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি আবাসন খাত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে ক্ষেত্রবিশেষে জড়িত। তবে সিটি করপোরেশন আওতাভুক্ত ১২৭ দশমিক ৬৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম সরাসরি পরিচালনা করছে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ লাইন রয়েছে দুই হাজার কিলোমিটারের কিছু বেশি। আর ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ লাইন রয়েছে ৩৭০ কিলোমিটার। যদিও ঢাকা ওয়াসার আওতাভুক্ত এলাকা ৪০০ বর্গকিলোমিটার। সব এলাকায় ঢাকা ওয়াসা ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তুলতে পারেনি।
অন্যদিকে রাজধানীতে ঢাকা জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন ২৬টি খাল রয়েছে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে ঢাকা ওয়াসা। দখল-ভরাটে এসব খালের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে মাণ্ডা, হাজারীবাগ, কসাইবাড়ী, সাংবাদিক কলোনি ও বাইশটেকি খাল ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হয়ে রয়েছে। ঢাকা ওয়াসা মাঝে মাঝে ফাঁকা বুলি ছাড়লেও সংস্থাটিকে কার্যকর কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এসব কারণেই ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার কোনো সুরাহা হচ্ছে না? বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার পানি সরে যাওয়ার কোনো পথই খোলা নেই? তাই একটু ভারী বৃষ্টি হলেই পানির নিচে চলে যায় সব?
জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসা নিরলসভাবে কাজ করেছে। প্রতিদিন গড়ে ২০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি ধারণের ক্ষমতা নগরীর নেই। তাই সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ঢাকা ওয়াসা একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নগরীতে জলাবদ্ধতা আর থাকবে না।
তিনি আরো বলেন, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা মহানগরীতে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস করছেন? এই শহরে বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে? ফলে শহরের বেশিরভাগ এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে?
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে গতকাল জলাবদ্ধতা বেশি ছিল উত্তর সিটিতে? এর মধ্যে কারওয়ান বাজার, গার্ডেন রোড, মিরপুর ১, মিরপুর ১০, কচুক্ষেত, শেওড়াপাড়া, মানিক মিয়া এভিনিউ, কালশী, শ্যামলী, মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নতুন বাজার, খিলখেতসহ বিভিন্ন এলাকা অন্যতম?
ঢাকার বেগুনবাড়ি, পান্থপথের বিভিন্ন এলাকা, ধানমণ্ডি, কুড়িল, পুরান ঢাকার আলাউদ্দিন রোড, যাত্রাবাড়ী মোড়, জুরাইন, শহীদনগর, মধুবাগে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় অল্প বৃষ্টিতেই? অলি-গলি হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে যায়?
পূর্ব জুরাইন থেকে ডিএনডি বাঁধ পর্যন্ত এলাকায় বছরের প্রায় প্রতিদিনই পানি জমে থাকে? এই এলাকাটি অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক নিচু হওয়ায় আশপাশের এলাকাসহ বাসা বাড়ির সুয়্যারেজের পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়?
নগরবিদ মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা নয় আছে জলজট। ড্রেন এবং খালগুলো সচল না থাকায় বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার কোনো রাস্তা পায় না। ঢাকার আশপাশের সব খাল এবং পুকুর ভরাট হয়ে গেছে, অনেকগুলো দখল হয়ে গেছে। কারও একক উদ্যোগে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মানুষকে এই জলজট থেকে বাঁচাতে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পিত উদ্যোগ।
নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরে পানি নিষ্কাশন মাধ্যমগুলো সঠিকভাবে মেইনটেনেন্স করতে হবে। এই কাজে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে কাজের ফল আসবে না।
ইত্তেফাক/এমআর
