জামসেদুর রহমান সজীব
গতকাল পর্যন্ত বেশ সুখেই ছিলেন জাফর সাহেব। কিন্তু হঠাত্ করে কী হলো, আজ তেমন একটা সুখ অনুভব করছেন না। অবশ্য সুখে থাকার কথাও না। বিশ্বের সুখী মানুষদের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। যদিও অসুখী হওয়ার কারণ আরও আছে। জাফর সাহেব নতুন ব্যবসা করতে গিয়ে ধরা খেয়েছেন। এমনকি ধরা খেয়েছেন পরকীয়া করতে গিয়েও। সব মিলিয়ে তার সুখের বারোটা বেজে গেছে।
পরকীয়ায় ধরা খাওয়ার পর বউ চলে গেছে বাপের বাড়ি। সেটা অবশ্য বিষয় না। বউ তাকে ডিভোর্স নোটিস পাঠিয়েছে। এটাও তেমন আহামরি বিষয় না। সমস্যা হলো বউয়ের বাপের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা করছেন জাফর সাহেব। এখন বউ বেঁকে বসা মানেই মহা মুশকিল। বউকে ঠাণ্ডা করতে তাই যমুনা ফিউচার পার্কে গিফট কিনতে এসেছেন। গিফট কিনে বেরিয়ে সিএনজি নিলেন। গন্তব্য ধানমন্ডি-১৫। কিন্তু হঠাত্ করেই শুনতে পেলেন বনানীতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। অমনি সিএনজি ওয়ালার ঘাড় ধরে ছুটলেন বনানীর উদ্দেশে। বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই।
সিএনজি নিয়ে এগুতে পারলেন না জাফর সাহেব। জ্যাম, মানুষের ঢল সামলে হেঁটেই পৌঁছালেন বনানীর দুর্ঘটনাস্থলে। চোখের সামনে এফ আর টাওয়ারে আগুনে জ্বলছে। নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বাঁচতে ভবনে আটকা অসহায় মানুষেরা লাফিয়ে পড়ছে নিচে। বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা। কী এক করুণ দৃশ্য! হাজার হাজার মানুষের ঢল রাস্তায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখছে। ঠিক দেখছে বললে ভুল হবে, যেন ‘উপভোগ’ করছে! মোবাইল বের করে ভিডিও করছে। জাফর সাহেব নাক সিঁটকালেন। অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘অমানুষের দল সব। একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা!’ তারপর আরও কয়েকজনকে ঠেলে সরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছিলেন না সবকিছু। কাছে গিয়ে সবকিছু দেখা দরকার তার!
অল্পসংখ্যক সাংবাদিকদের দেখতে পেলেন জাফর সাহেব। আনমনেই নিজের চুল, শার্ট ঠিক করে নিলেন। যদি ইন্টারভিউ দেওয়া লাগে। সাংবাদিকদের সিক্সথ সেন্স ভয়াবহ রকমের। তারা হাজার হাজার মানুষের মধ্য থেকে ঠিক বলদ কাউকেই খুঁজে বের করে ইন্টারভিউয়ের জন্য। জাফর সাহেবের পাশের একজনকেই বেছে নিলেন এক সাংবাদিক। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার পরিচিত কেউ কি এই ভবনে আটকা পড়েছে?’
‘না ভাই।’ নির্বিকারভাবে লোকটির জবাব।
‘আপনি কোথায় থাকেন?’ সাংবাদিকের প্রশ্ন।
‘রামপুরায় থাকি ভাই।’
‘বনানীতে এসেছেন কেন?’
‘এই যে অগ্নিকাণ্ড দেখতে আইছি ভাই।’ লোকটার সোজাসাপ্টা জবাব। সেই জবাব শুনে সাংবাদিক একেবারে থ মেরে গেলেন। কী জিজ্ঞেস করবে ভেবে পান না। জাফর সাহেব রীতিমতো রাগে ফোঁস ফোঁস শুরু করে দিলেন। মনে মনে বলতে লাগলেন, ‘আরে হালায়, তুই রামপুরা থেকে বনানীতে আইছস অগ্নিকাণ্ড দেখতে! মনডা চায় তোর মুখের ভিতরে বরফকুচি ঢুকায়া ঠাটায়া একটা চড় লাগাই।’ কিন্তু পরমুহূর্তেই চিন্তা করলেন, তিনি নিজেও তো ধানমন্ডি না গিয়ে বনানীতে এসেছেন অগ্নিকাণ্ড দেখতে। আবেগ কন্ট্রোল করলেন জাফর সাহেব। ভাবলেন, এটা তো অতটা দোষের কিছুও না। অগ্নিকাণ্ড দেখতে আসা যেতেই পারে। মানুষ কখন কার উপকারে আসে তার তো আর ঠিক নেই। তিনি সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ওই লোক আর সাংবাদিকদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলেন।
জায়গা পরিবর্তন করতে গিয়ে কলজে শুকিয়ে গেল জাফর সাহেবের। এত মানুষ। তার মনে হলো ঢাকার সব মানুষ বুঝি এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। একজন তাকে একনাগাড়ে গুঁতিয়ে সরানোর চেষ্টা করছিল। তিনি লোকটাকে ধমক মেরে বসলেন। বললেন, ‘কীরে ভাই! এত ঠেলেন কেন? যাবেন কই, আগুনের ভিতরে?’ অপর লোক গলায় ঝাঁজ নিয়ে জবাব দিল, ‘ওই মিয়া, আপনে তো দেখছেনই সব। আমগোরেও দেখতে দেন, জায়গা করে দেন। আইছি ঘণ্টাখানেক হলো এখনো মেইন জিনিসই দেখতে পারি নাই!’ লোকটার জবাব শুনে জাফর সাহেবের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। মেইন জিনিস আবার কীরে ভাই! মাথা চুলকিয়ে যতক্ষণে ভাবতে লাগলেন বিষয়টা, ততক্ষণে লোকটা তাকে গুঁতিয়ে ঠেলে সরিয়ে ভবনের সামনে এগিয়ে গেল।
ভিড় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করলেন জাফর সাহেব। পথিমধ্যে একজনকে বলতে শুনলেন, ‘আমরা কিন্তু কম সহযোগিতা করি নাই। অ্যাম্বুলেন্সকে রাস্তা করে দিয়েছি। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার রাস্তা করে দিয়েছি। ঠ্যালা আছে!’ জাফর সাহের ঠোঁট বাঁকালেন। মনে মনে বললেন, ‘এহ! জবর কাজ করছ। আরে বেটা তুই ক্যামনে রাস্তা করবি? রাস্তা তো আগে থেকেই আছে। তোদের কারণেই অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না। রাস্তাটা তো তোরাই ব্লক করে রেখেছিস। আবার বড় বড় ডায়লগ দিস।’ এমন সময় ফায়ার সার্ভিসের একটা গাড়ি ভিড় সরাতে না পেরে হর্ন দিয়েই যাচ্ছে। মন-মেজাজ এমনিতেই খারাপ জাফর সাহেবের। হর্নের আওয়াজে তা চরমে পৌঁছাল। খেঁকিয়ে উঠে বলেই বসলেন, ‘আরে বেটা দেখিস না হাঁটতে পারতেছি না, প্রচণ্ড ভিড়। গাড়িতে বসলেই হর্ন দেওয়া লাগে? না সরলে যাইতে পারবি? দে আমার গায়ের ওপর দিয়েই গাড়ি উঠিয়ে দে!’
অবশেষে ভিড়-ভাট্টা ছাপিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেন জাফর সাহেব। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হকারের কাছ থেকে চা নিলেন। এখানে দাঁড়িয়েও দূরের ওই অগ্নিকাণ্ড দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিতেই তার মনে পড়ল, আগুন লাগা ভবনটার কাছে দাঁড়িয়ে মোবাইলে তিনি সেলফি তুলেছেন কয়েকটা। একটা অন্তত ফেসবুক পোস্ট দেওয়া দরকার। ফটো এডিটর অ্যাপস দিয়ে সেলফিগুলো এডিট করলেন তিনি। সাজিয়ে গুছিয়ে একটা পোস্টও লিখে ফেললেন। লেখাটা ঠিক এরকম—আমরা ৯০ কোটি টাকা খরচ করে ‘মানব পতাকা’ বানাই! আমরা ৩০০০ কোটি টাকায় মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাই! ১২০০ কোটি টাকায় রোবট সোফিয়া ভাড়া করি! ১৪০০ কোটি টাকা দিয়ে বিমানবন্দরের নাম চেঞ্জ করি! কিন্তু আজও আমরা পারলাম না উন্নত ইন্সট্রুমেন্টস-সম্পন্ন একটা ‘ফায়ার সার্ভিস’ উপহার দিতে! এই ব্যর্থতা রাষ্ট্রের!!
পোস্ট শেষে আয়েশ করে একটা বিড়ি টানতে টানতে তিনি চললেন ধানমন্ডির পথে, নিজের বউয়ের কাছে। যাত্রাপথে চেক করতে ভুললেন না তার ফেসবুক পোস্টে মোট কতটি লাইক-কমেন্ট পড়েছে!
