ভোজনং সর্বনাশং

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ২১:১৮

 

ফারুক হোসেন সজীব

 

নতুন দম্পতি! বিয়েটা করেছিল তারা রেস্টুরেন্টে খেতে খেতেই। এজন্য তারা এখন মহাখুশি! ডিফ্রেন্ট টাইপের বিয়ে বলে কথা! আজকাল যাদের বিয়ে যত বেশি ডিফ্রেন্ট তাদের ডিমান্ডও তত বেশি!

যা হোক, এই সক্কাল-সক্কাল স্ত্রী আবার চেঁচাচ্ছে, ‘ওগো শুনছ! আজ নাকি পহেলা বৈশাখ?’

স্বামী ঘুম থেকে উঠতে উঠতে বললেন, ‘বৈশাখ? ওসব বৈশাখ-টৈশাক—কোনো শাকই আজকাল আমার মনে থাকে না, জানো তো! আর কে মনে রাখে এসব?’

স্ত্রী বলল, ‘রাখতে হয়, না রাখলে চলে? একটা ইয়ে আছে না?’

‘ইয়ে! ইয়েটা কি শুনি?’

‘আরে বুঝলে না! আজকের দিনের জন্য না হয় এসো।’ ‘আমরা বাঙালির সাজে সাজি! এক সাথে বলি—এসো হে বৈশাখ!’

‘তা অবশ্য মন্দ বলোনি! তো কী করতে হবে এখন?’

‘কী করতে হবে মানে, জলদি বাজারে যাও! আর ঝটপট ইলিশ কিনে আন। আমি তো সব বন্ধুবান্ধবীদের দাওয়াত করে ফেলেছি! ওরা খুব করে ধরল, পান্তা-ইলিশ ভোজন করবে! মাখনের মতো মন আমার, তুমি তো জান! তুমিই বলো আমি কী ভুল করেছি?’

‘না না! কী যে বলো, ভুল করবে কেন? এটা তো বেশ ভালোই করেছ! কারণ বন্ধুুরা তো প্রায়ই আমাদের নিয়ে কানাঘুষা করে। বলে কি না, বাঙালি কালচার ভুলে গেছি, পরগাছা হয়ে যাচ্ছি বিদেশি স্টাইলে! এই তো সুযোগ ওদের বুঝিয়ে দেওয়ার! আমরা কত খাঁটি বাঙালি আজ বুঝিয়ে দেব!’

‘ঠিক বলেছ, এটাই সেই সুবর্ণ সুযোগ, হেলায় হারাতে নেই!’

‘যাও যাও জলদি বাজারে যাও। বাজারে গিয়ে একটা ইলিশ, না একটা না, দুইটা ইলিশ কিনে নিয়ে এস!’

স্বামী ঢোঁক গিলে বলল, ‘কিন্তু একটা প্রবলেম আছে!’

‘প্রবলেম! কী প্রবলেম? টাকা নেই বুঝি?’

‘আরে না, কী যে বলো! বলছিলাম, আমি তো ইলিশ চিনি না! আসলে কোনোদিন বাজারে যাইনি তো!’

‘ধুত্তরি! এটা কোনো প্রবলেম হলো? রিকশাওয়ালাকে দশ টাকা বাড়িয়ে দিও! সেই কিনে দেবে! স্বামীবেচারার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল, সত্যি তো! আগে ভেবে দেখিনি! তোমার এত বুদ্ধি!’

শুনে স্ত্রী কেমন অদ্ভুত লাজুক হেসে বলল, ‘হয়েছে হয়েছে! এখন বাজারে যাও তো, ওরা এই এলো বলে!’

 

বেচারা রিকশায় উঠে দেখল, রিকশাওয়ালা বেশ আরাম করে রিকশা চালাচ্ছে!

হঠাত্ বলল, ‘ভাই রিকশাওয়ালা! আমাকে দুটি ইলিশ কিনে দিতে পারবে?’ রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে একটু হাসল যেন! ‘পারমু না মানে, আলবত পারুম! খালি ট্যাহা দিয়েই দ্যাহেন!’

‘প্রবলেম নেই ভাই! আমি এজন্য তোমায় পঞ্চাশ টাকা বকশিস দেব!’

শুনে রিকশার গতি কেমন বেড়ে গেল। রিকশাওয়ালা বাজারের কাছে গিয়ে রিকশা থামিয়ে বলল, ‘দ্যান ভাই ট্যাহা দ্যান! ইলিশের বাজার আজ আগুন!’

‘দুটি ইলিশ কিনতে কত লাগতে পারে?’

‘দ্যান হাজার তিনেক! ইলিশের বাজার তো আগুন ভাইজান!’

বেচারা তিন হাজার টাকা বের করে দিল। রিকশাওয়ালা টাকাটা হাতে নিতে নিতে বলল, ‘আচ্ছা, ভাইজান একটা কথা কমু! যদি কিছু মনে না করেন!’

‘আহা! মনে করব কেন? বলো বলো!’

‘মানে, আপনি ইলিশ কিনতে গেলেই তো পারতেন।’

বেচারা আমতা আমতা করে বলল, ‘আসলে ব্রাদার! আমি ইলিশ মাছ চিনি-ই না! খেয়েছি কেমন অদ্ভুত টেস্ট আর দারুণ সেন্টও হয়! আমার আবার ভাই অ্যালার্জি ভীষণ! ঐ জিনিস খেলেই সারা শরীর জ্বলে!’

‘ও আচ্ছা! আচ্ছা!’ রিকশাওয়ালা মনে মনে ভাবল, ‘পাইছি একখান মাল! আজ তোর বাঙালিগিরি ছুটাইবোনে!’ কিছুক্ষণ পরই রিকশাওয়ালা এসে হাজির। এসেই হলদে দাঁত বের করে বলল, ‘আনছি স্যার! এই দ্যাহেন! ইয়া বড়! তাই না?’

‘এত্ত বড়? কিন্তু তুমি তো ভাই তিনটে ইলিশ নিয়ে এসেছ!’ ‘এর মধ্যে একটা তো ভাই ভীষণ ছোট! মানেটা কী?’

‘ভাইজান, ওটা আমি কিনলাম! আপনার জন্য ইলিশ কিনতে গিয়ে ভাবলাম, আমিও একটা কিনে ফেলি! কিন্তু আমি ইলিশ কিনতে পারি নাই! আমি কিনেছি চিনলিশ মাছ! আমাদের কি আর ইলিশ খাওনের মতো অত টাকা আছে ভাইজান?’

‘তা ঠিক! তা ঠিক! কিন্তু চীনলিশ মাছ আবার কী? এটা তো কোনোদিন শুনি নাই?’

রিকশাওয়ালা দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘শুনেছি, চীন দেশ থেকে এই মাছ এসেছে! আর দেখতেও বাংলার ইলিশের মতোই ফর্সা সুরত চেহারা! তাই এটার নাম—চীনলিশ মাছ!’

‘বাহ! বাহ! আপনি তো ভাই রসিক-টসিক মানুষ!’

‘লজ্জা দিয়ে না ভাইজান! আছি একটু-আধটু!’

 

অবশেষে, হাঁপাতে হাঁপাতে স্বামীবেচারা বাসায় এসে পৌঁছাল। দেখল, বাসায় একদম হুলুস্থূল অবস্থা বিরাজ করছে। মনে মনে ভাবল, এর মধ্যেই এত্তগুলো ছেলে আর স্লিম ফিগারের মেয়েরা এসে হাজির? একটিকেও তো চিনতে পারছি না। সবাই কেমন শাড়ি পড়ে আছে।

কিন্তু এরা সবাই কারা? স্বামীবেচারা মনে মনে বলল, ‘কন হো তুম?’

স্ত্রী এসে বলল, ‘সেকি! তোমার আসতে এত্ত দেরি হলো?

ও তুমি শাড়ি পরেছ? তোমাকে তো চিনতেই পারিনি! ভাবলাম, কে না কে হবে ? আর ওই মেয়েগুলো কারা?’

‘বারে তুমি দেখছি কাউকেই চিনতে পারছ না, ওটা তো- তানিয়া! আর ওই যে ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওটা তো প্রতিভা!’

স্বামী গোবেচারা অবাক হয়ে বলল, ‘আহা! মেয়েটির কী প্রতিভা! চেনাই যাচ্ছে না!’

‘কই দেখি এনেছ ইলিশ?’

‘হ্যাঁ এনেছি!’

স্ত্রী স্বামীর গাল ধরে বলল, ‘ও-ও-লে আমার সোনা!

যাই ইলিশগুলো রেডি করে ফেলি দুপুর তো প্রায় হয়ে এল। ওরা আবার খাই খাই করছে।’ স্ত্রী কাজের মেয়েটিকে ডাকতে ডাকতে রান্নাঘরে চলে গেল। গিয়ে বলল, ‘তুমি এই মাছগুলো ভালো করে ভেজে ফেলে জলদি! আমি পান্তা টেবিলে সাজাচ্ছি, কেমন?’

কাজের মেয়েটি মাছ দেখে তো অবাক! মনে মনে ভাবল, ‘কী আশ্চর্য! এটা আবার কী মাছ নিয়ে এসেছেন ভাইজান! আজকের দিনে কেউ এই মাছ আনে? আচ্ছা যা এনেছে তাই ভেজে দেই, আমার কী?’

 

খাবার পরিবেশনও শেষ। এবার ভোজনের পালা। কিন্তু সবাই পান্তা-ভাত আর ইলিশ খেতে খেতে কেমন নাক ছিটকাচ্ছে। আর ওপাশ থেকে কাজের মেয়েটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে!

তানিয়া বলল, ‘আচ্ছা, পান্তা- ইলিশ খেতে কেমন যেন লাগছে তাই না? প্রতিভা বলল, হ্যাঁ তাই তো! ইলিশ-ইলিশ মনে হচ্ছে না!’

সবাই বলল, ‘হ্যাঁ তাই তো, খেয়ালই করিনি! কিছুতেই ইলিশ-ইলিশ মনে হচ্ছে না?’

ওপাশে কাজের মেয়েটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে হাসছে। স্ত্রী তো রেগেই আগুন! স্বামী গোবেচারাকে বলল, ‘তুমি কি ইলিশ নিয়ে এসেছ? একটুও সেন্ট নেই?’

স্বামী বলল, ‘আহা! আমি তো ইলিশ-ই এনেছি!’

কাজের মেয়েটি বলল, ‘ভাইজান আপনি ইলিশ মাছ আনেন নাই আপনি এনেছেন, সিলভার কার্প মাছ! দেখতে অবশ্য ইলিশের মতোই লাগে!’

‘কী বললে?’ স্বামীবেচারা বিড়বিড় করে লাগল, ‘তাহলে কি রিকশাওয়ালা আমাকে ঠকালো?’

স্ত্রী খাওয়া বাদ দিয়ে বলল, ‘কী বিড়বিড় করছ?’

‘ইয়ে মানে, ওই রিকশাওয়ালা বজ্জাতটার কাজ এটা! ওই বেটাই তো কিনে আমার হাতে ধরিয়ে দিল!’

শুনে সবাই অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি দেখেও চিনতে পারলেন না? তার মানে আপনি ইলিশ মাছ চিনেন না? সবাই কেমন ফিক ফিক করে হাসতে লাগল। আর স্ত্রীবেচারির শরীরও জ্বলতে লাগল!’

স্বামীবেচারা মনে মনে বলল, ‘কেন যে স্ত্রীর কথায় ইলিশ ভোজনে রাজি হয়েছিলাম?’

‘আহা! ভোজনং সর্বনাশং!’

‘তবে কী রিকশাওয়ালার মাছটিই ইলিশ মাছ ছিল?’

‘আর তার দুটি মাছ কি তবে চীনলিশ মাছ?’

স্বামীবেচারা আর দেরি করল না, উঠে গিয়ে ল্যাপটপ অন করল, তারপর ইলিশ মাছ চিনতে, গুগুল মামার আশ্রয় নিল! আহা! গুগুল মামা ছাড়া আর কোনো উপায় আছে?