শিমুল শাহিন
দুপুরে বাসায় ফিরতেই আম্মুর সামনে পড়লাম। আম্মুর মুখের দিকে তাকাতেই বুঝলাম নিশ্চিত কোনো একটা বিষয় নিয়ে ভীষণ রেগে আছে! কিছু বুঝে উঠার আগেই আম্মু অনেকটা হুঙ্কার ছেড়ে আব্বুকে ডাকল, ‘ওগো, জলদি বাইরে আসো!’ আম্মুর ডাক শুনে তড়িত্ গতিতে পাশের ঘর থেকে আব্বুু ছুটে এলেন! ছোটবোন রীতাও আম্মুর ডাক পেয়ে বেরিয়ে এল তার ঘর থেকে। আম্মু হঠাত্ এমন লঙ্কাকাণ্ড কেন ঘটালো কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না! বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একবার আব্বুুর মুখের দিকে আরেকবার আম্মুর মুখের দিকে তাকাচ্ছি!
শেষমেশ আম্মুর দিকে চেয়ে বললাম, ‘কী ব্যাপার আম্মু, ঘটনা কী?’
আমার দিকে চোখ লাল করে তাকিয়ে আম্মু জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কী সিগারেট খাস? সত্যি করে বল!’
আমতা আমতা করে বললাম, ‘কী যে বল না, আমি সিগারেট খেতে যাব কেন?’
আমার উত্তর শুনে আম্মু আরো আক্রমণাত্মক স্বরে বলল, ‘সিগারেট খাস না তো আমতা আমতা করছিস কেন? তুই তোর বাবার মাথায় হাত রেখে বলতে পারবি যে সিগারেট খাস না?’
আমি হাসতে হাসতে মায়ের মাথার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘বাবার মাথায় কেন, তোমার মাথায় হাত রেখে নাহয় বলি আমি সিগারেট খাই না!’
আম্মুর মাথার দিকে হাত বাড়াতেই আম্মু একধাপ পিছনে সরে গেল! আর মাথা সরিয়ে নিতে নিতে বলল, ‘খবরদার, আমার মাথায় হাত রেখে তোকে কসম খেতে হবে না! আমি জানি আমার মাথায় হাত রেখে তুই আর তোর বাপ দুজনেই দিব্যি মিথ্যে কসম খেয়ে নিতে পারবি! আমি মরলেই তো তোর বাপ নতুন বিয়ে করবে আর সাথে সাথে তুইও নতুন মা পাবি! তোদের চালাকি বুঝি না মনে করেছিস!’
আম্মুর কথা শুনে বাবা ঘন ঘন গলা খাঁকারি দিতে লাগল। একটু সলজ্জ ভঙ্গিতে বলল, ‘কথা হচ্ছে তোমার ছেলের সিগারেট খাওয়া নিয়ে, অথচ এর মধ্যে আমাকে টানা কেন?’
আম্মু আব্বুুকে তার চিরায়ত ধমক দিয়ে বলল, ‘চুপ থাকো তুমি, তোমাকেও আমার চেনা আছে! তুমিও তো এমন লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খেতে, তোমার সিগারেট ছাড়াতে আমাকে কতটা কষ্ট পোহাতে হয়েছে তা শুধু আমিই জানি!’
পূর্বের এসব ঘটনা মনে হওয়াতেই হয়তো আব্বুু অনেকটা চুপসে গেলেন! আমিই আম্মুর পাশে এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা, কসম টসম বাদ দাও তো, ঘটনাটা কী আমাকে বলো আগে!’
আম্মু বলল, ‘আজ হাতে কাজ ছিল না বলে ভাবলাম তোর বুকসেল্ফের বইগুলো পরিষ্কার করি। বইগুলো ঝেড়েমুছে রেখে ডায়েরিগুলোতেও হাত দিলাম। তখনই তো হাতেনাতে প্রমাণ পেয়ে গেলাম!’
অবাক হয়ে বললাম, ‘কীসের প্রমাণ?’
‘কীসের আবার, তুই যে সিগারেট ধরেছিস, সেটার!’
আম্মুর কথা শুনে বেশ অবাক হলাম! সিগারেট যে দু-একটা খাই না তা নয়! তবে বাসায় খাওয়া দূরের কথা, বাইরে বন্ধুদের আড্ডায় দু-একটা খেলেও আম্মুর কাছে ধরা খাওয়ার ভয়ে রীতিমতো মিষ্টি মসলা দিয়ে পান খেয়ে বাসায় ঢুকি! আর গলির রাজনের পান-বিড়ির দোকানে তো একটা বডি স্প্রে কিনে রেখে দিয়েছি, বাসায় ঢুকার আগে শরীরে স্প্রে করে তারপর বাসায় ঢুকি! এত সাবধানে সিগারেট খাওয়ার পরেও আম্মু কেমনে বুঝল আমি সিগারেট খাই সেটা মাথায় কুলাল না! কৌতূহল দমাতেই আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি তো সিগারেট খাই-ই না! তারপরও আমি যে সিগারেট খাই সেটা কী দেখে সন্দেহ করলে সেটা বলো তো!’
আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আম্মু টেবিলে রাখা একটা ডায়েরি তুলে আমাকে দিলেন। হাতে নিতেই দেখলাম এটা আমারই ডায়েরি! ডায়েরি হাতে নিয়েও কোনো কিছু বুঝলাম না! বিরক্তসহকারে আম্মুকে বললাম, ‘এটা তো আমার ডায়েরি, একটু খুলে বলবে কী হয়েছে?’
আম্মু আমার কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বললেন, ‘আমাকে খুলে বলতে হবে না, হাতের ডায়েরিটাই খুলে দেখ বুঝতে পারবি!’
ডায়েরির পাতা উল্টাতেই চোখে পড়ল বেশ পুরোনো একটা সিগারেট চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে পাতার মাঝে রাখা আছে! আম্মুর এমন লঙ্কাকাণ্ডের কারণ এতক্ষণে বুঝতে পারলাম। কিন্তু সিগারেটটা কিভাবে ডায়েরির মধ্যে এসে অবস্থান নিল তা মাথায় এল না! কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তার পর তা কিছুটা পরিষ্কার হলো! নিশ্চয়ই মেসে থার্টি ফার্স্ট নাইটে বন্ধুদের সঙ্গে সিগারেট খাওয়ার সময় ওদের অগোচরে ডায়েরির মধ্যে থেকে গেছে একটা! বন্ধুদের এমন অসাবধানতার জন্য মনে মনে একেকজনকে খিস্তি দিলাম।
এভাবে আম্মুর কাছে রাম ধরা খেয়ে গেছি, এটা থেকে উদ্ধার না পেলে আমার খাওয়া দাওয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে পারে এ আশঙ্কায় আঁতকে উঠলাম! এদিকে প্রচণ্ড ক্ষুধাও পেয়েছে।
বন্ধুরা প্রায়শই আমার প্রশংসা করে বলত আমার নাকি প্রচণ্ড উপস্থিত বুদ্ধি! অথচ এমন কঠিন সময়ে কি না আমার মস্তিষ্ক বেয়ে সুবুদ্ধি বা কুবুদ্ধির কোনোটাই বেরিয়ে আসছে না!
আম্মুর চক্ষু ক্রমশ লালাভ হচ্ছে দেখেই কি না গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম, ‘আসলে আম্মু গতবারের জন্মদিনে বন্ধুদের কাছ থেকে বেশকিছু উপহার পেয়েছিলাম! সেগুলোর মধ্যে কয়েকটা বই ছিল, আর কয়েকটা গিফটবক্স। সেই গিফটবক্সগুলোর একটা খুলতেই দেখতে পেলাম কেউ বদমায়েশি করে সিগারেট গিফট করেছে!’
আমার কথা শেষ না হতে আম্মু আঁতকে উঠে বলল, ‘তার মানে আমার ধারণাই ঠিক, তোর বন্ধুরা জানে যে তুই সিগারেট খাস সেজন্যই গিফট করেছিল!’
আম্মুকে একটু আশ্বস্ত করে বললাম, ‘না সেটা নয়, ওদের কেউ মজা করেই দিয়েছিল!’
‘আচ্ছা, বুঝলাম মজা করেই সিগারেট গিফট করেছিল, কিন্তু তাই বলে সিগারেটটা ডায়েরির ভিতরে কেন?’
আম্মু একটু শান্ত হয়ে এসেছে দেখেই কি না মাথাতে হঠাত্ একটা বুদ্ধি এসে গেল! বললাম, ‘আসলে আম্মু তোমার ডায়েরিগুলোর মধ্যে দেখতাম বিশ বছর বা তারও আগের আব্বুুর দেওয়া গোলাপের পাঁপড়িগুলো কী যত্নে রাখা আছে! আমি জানি, পুরোনো এ গিফটগুলো তোমায় স্মৃতিকাতর করে তোলে!’
আমার কথাগুলো শুনে আব্বুু আবারো সলাজে গলা খাঁকারি দিতে লাগল! আম্মুর রাগান্বিত মুখটায় কিঞ্চিত্ হাসির ছোঁয়া এসে লাগল! তারপরও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বলল, ‘কিন্তু সেসবের সাথে তোর সিগারেটের কী সম্পর্ক?’
আর ডিফেন্সিভ খেলিনি, মায়ের প্রশ্নটাকে ফুলটচ বলের মতো জোরে হাঁকিয়ে ওভার বাউন্ডারি মারলাম! হেসে বললাম, ‘কী যে বল না, ওই সিগারেটগুলাও তো গিফটই ছিল! পুরো প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট তো ওজন্যই ডায়েরির পাতায় রেখে দিসি! ভবিষ্যতে বহু বছর পর যখন সিগারেটটা দেখব, তখন অনেক আনন্দ পাব, স্মৃতিকাতর হব! এই তো দেখো এখনো যেমন বেশ স্মৃতিকাতরহয়ে গেছি, আহা!’
আমার উত্তরে আম্মু পুলকিত না হলেও আপাতত কিছুটা সন্তুষ্ট হয়েছেন সেটা বোঝা গেল! রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার টেবিলে বস, খাবার দিচ্ছি!’
আম্মু রান্নাঘরে যেতেই আব্বুু ও রীতার দিকে মুচকি হেসে তাকালাম! আব্বুু পাশে এসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন আর চাপাস্বরে বললেন, ‘এত বুদ্ধি কই পেলি তুই! এরকম বুদ্ধি থাকলে আমাকেও অকালে সিগারেটটা ছাড়তে হতো না!’
