ঝুঁকিপূর্ণ শতাধিক ঐতিহ্যবাহী ভবনে কয়েকশ পরিবার

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৭, ০৩:৫০

রাজধানীর পুরান ঢাকায় শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ হেরিটেজ ভবনে বসবাস করছে কয়েকশ পরিবার। প্রতিটি ভবন দেড় থেকে ২০০ বছরের পুরনো হওয়ায় ভবন ধসের আতঙ্কে আছেন হাজার হাজার মানুষ। মৃত্যু ঝুঁকি জেনেও সরকারি বিধি-নিষেধের কারণে ভবন সংস্কার করতে পাছেন না তারা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভবন সংস্কারের অনুমতি চাইলেও তা দিচ্ছে না নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

শতাধিক বছরের পুরনো এ সব ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ির দেয়ালের আস্তর অনেক আগেই খসে পড়েছে। অনেক বাড়ির ইটের গাঁথুনি হয়ে পড়েছে নড়বড়ে। দেয়ালে বড় বড় ফাঁটলের চিহ্ন বেশ স্পষ্ট। বৃষ্টি নামলেই দেয়াল বেয়ে পানি পড়ে। তা ছাড়া প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ঘটছে প্রাণহানিও। তবু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি নন এখানকার বাসিন্দারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রূপলাল হাউসটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে রয়েছে। দোতলা ভবনটির নিচের অংশ দখল করেছে ফরাশগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। তারা ভবন দখল করে এখানে আদা-রসুন, পিঁয়াজ, হলুদ ও মরিচের আড়ত গড়ে তুলেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটির দোতলায় বিজিবি ও আনসার সদস্যরা পরিবার-পরিজন নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করছেন।

আমজাদ হোসেন নামে একজন ব্যবসায়ী জানান, প্রতিদিনই ভবনের গা থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। ইতোমধ্যেই ভবনের কিছু অংশ ধসে পড়েছে। সংস্কারের অনুমতি চেয়ে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চেয়েও তা পাওয়া যায়নি। সর্বোপরি আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি।

পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজার ১০ নম্বর লেনের বাসিন্দা গোবিন্দ চন্দ্র দে বলেন, প্রায় দেড়শ বছর আগে তার দাদা প্রাচীন এ বাড়িটি কিনেছিলেন এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। বংশপরম্পরায় বর্তমানে ৫ ভাইয়ের সঙ্গে এ বাড়িতেই বসবাস করছেন তিনি। তবে প্রাচীন স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এ বাড়ির ভেতরের দেয়াল থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা। সরকারি বিধি-নিষেধের কারণে নিজেদের বাড়িগুলো সংস্কার করতে পারছেন না মালিকরা। ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছেন বাসিন্দারা। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে ভবন ধসে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর রাজউক, বুয়েট ও ঢাকা সিটি করপোরেশন কারিগরি জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও ঐতিহ্যবাহী ভবন শনাক্ত ও তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। ১৫৭৩টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে ঢাকায় শতাধিক হেরিটেজ ভবন শনাক্ত করা হয়। যার মধ্যে ৯৩টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে শনাক্ত করা হয়।

একই সঙ্গে হেরিটেজ ঘোষিত এলাকা হিসেবে রাজউক ঋষিকেশ রোড, রেবতীমোহন দাস রোড, বি কে দাস রোড, ফরাশগঞ্জ রোড, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, পানিতলা, প্যারিদাস রোড ও হেমন্ত দাস রোডের নাম তালিকাভুক্ত করে। গেজেট আকারে তালিকাভুক্ত এসব এলাকার মধ্যবর্তী বসতবাড়ি, ইমারত, রাস্তা, গলি ও উন্মুক্ত চত্বরও হেরিটেজ হিসেবে গণ্য হয়।

ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক মো. আজিম বকস বলেন, ঐতিহ্যের নিচে আতঙ্কের দিনযাপনে বাধ্য হওয়া মানুষগুলো চান প্রয়োজনে সরকার তাদের জমিজমা নিয়ে অন্য কোথাও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি-অবিভক্ত) পৃথক দুটি তালিকা এবং সংস্থা দুটির সমন্বয়হীনতার কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার অনেক বাসিন্দা।

আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বলেন, পুরান ঢাকায় তালিকাভুক্ত হেরিটেজ এলাকার সব ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে পলেস্তারা পড়েও মানুষ আহত হন বা ক্ষতিগ্রস্ত হন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইতোমধ্যেই ব্যক্তি মালিকানাধীন একাধিক বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাই সরকারকে হেরিটেজ সংরক্ষণের পাশাপাশি মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান ও সম্পদের মূল্য প্রাপ্তিতে ওইসব ভবনের মালিকদের অন্যান্য দেশের মতো টিডিআর (ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইট) হস্তান্তরযোগ্য উন্নয়ন অধিকার দিতে হবে।

হেরিটেজ ভবন সংরক্ষণ ও ভবনগুলোর মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এখনো এ নিয়ে তেমন কোনো আইন হয়নি। তবে পুনর্বাসনের মাধ্যমে ওই ভবনগুলোর বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে। আবার তাদের ভবনগুলো না ভেঙে ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও একটা ব্যবস্থা করা যায়। এ ক্ষেত্রে নগর উন্নয়ন কমিটিই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দেশের ৪৫৫টি হেরিটেজ এলাকা সংরক্ষণের কাজ করছে। রাজধানীর হেরিটেজ এলাকা নিয়ে রাজউক গেজেট প্রকাশ করেছে। গেজেট অনুসারে ওইসব এলাকার বা স্থাপনার সংস্কার বা ভেঙে ফেলার অনুমোদন রাজউকই দিতে পারে। এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো ভূমিকা নেই।

ইত্তেফাক/নূহু