ফেনীর সোনাগাজীর ঘটনাটিকে কেবল মর্মান্তিক বলিলে কম বলা হইবে। শরীরের কোথাও সামান্য একটুখানি আগুনে পুড়িয়া গেলে যে কেহ উপলব্ধি করিতে পারেন অগ্নিদগ্ধের ভয়ঙ্কর কষ্ট। আর শরীরের যদি ৮০ শতাংশের বেশি পুড়িয়া যায় তাহা হইলে দগ্ধব্যক্তি কেবল নরক-যন্ত্রণায় ভোগেন না, তাহার জীবনসংশয়ের আশঙ্কাও অনেক বাড়িয়া যায়। কারণ কাহারো শরীরের মাত্র ১৫ শতাংশের অধিক পুড়িয়া গেলেই তাহার জীবনসংশয়ের সতর্কসংকেত দেখা দিতে শুরু করে।
ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাতও এখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। গত শনিবার আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে আগুন ধরাইয়া দেওয়া হইয়াছে নুসরাতের শরীরে। নুসরাতের ‘অপরাধ’ ছিল যে, তাহার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ তাহাকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করিবার কারণে নুসরাত থানায় মামলা করিয়াছিল। নুসরাতের ওপর মামলা তুলিয়া লইবার চাপ ছিল। কিন্তু নুসরাত সেই চাপে মাথানত করেন নাই। তাই, তাহাকে উচিত শিক্ষা দিতে তাহার গায়ে কেরোসিন ঢালিয়া আগুন ধরাইয়া দেওয়া হয়। এইখানে উল্লেখ্য যে, গত ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় নিজের কক্ষে ডাকিয়া লইয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা শ্লীলতাহানি করিবার অভিযোগে মামলা করা হয় এবং ওই মামলায় অধ্যক্ষ এখনো কারাগারে। ঘটনার পর হইতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করিয়াছে। আরেকটি অংশ অধ্যক্ষের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করিয়াছে।
দুঃখজনক ঘটনা হইল, নুসরাতের গায়ে যাহারা আগুন দিয়াছে তাহারাও কি না শিক্ষার্থী! গতকাল শনিবার সকালে নুসরাত যখন পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে আসেন, তখন নুসরাতকে মুখোশপরিহিত কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায় যে, তাহার এক বান্ধবীকে ছাদে পিটানো হইতেছে। নুসরাতের পরিবার অভিযোগ করিয়াছে যে, মুখোশপরিহিত ওই শিক্ষার্থীরাই নুসরাতকে মিথ্যা বলিয়া পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে শরীরে কেরোসিন ঢালিয়া আগুন ধরাইয়া দেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনলাইনে সংবাদটি প্রকাশের পর কোথাও কোথাও পাঠক এমন মন্তব্যও করিয়াছেন যে, অপরাধীকে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নিয়ে যাওয়া হউক। কেহ কেহ অধ্যক্ষের কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা বলিয়াছেন। র্যাবের হস্তক্ষেপও দাবি করিয়াছেন অনেকে।
কিছু কিছু এমন নিকৃষ্ট ঘটনা আছে, যাহা সম্পর্কে যত কম বলা যায় ততই ভালো। নুসরাতের গায়ে আগুন লাগাইবার ঘটনাও তেমনি একটি দৃষ্টান্ত। বেশিরভাগ মানুষ যেমন এইসকল সংবাদ পড়িয়া মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করেন, তেমনিভাবে কিছু কিছু বিকৃত মানুষ এই ধরনের ঘটনা জানিয়া কাহারো প্রতি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিবার চটজলদি উপায়ও খুঁজিয়া পান। দেখা গিয়াছে যে, যখন কোনো বিশেষ অপরাধের ঘটনা ভাইরাল হয়, তখন সেই ধরনের অপরাধের মাত্রা সমাজে বৃদ্ধি পায়। সুতরাং নুসরাতের প্রতি এমন ধরনের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিবার ঘটনার ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমকে সতর্ক হইতে হইবে। অন্যদিকে, এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীদের সমুচিত শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
