শিশুদের উপর চাপ কমাতে হবে

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ২২:১৯

মো. আরিফুল ইসলাম

আমাদের সমাজে শিশুদের দিয়ে চালানো হচ্ছে এক ভয়ানক আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা। বাচ্চারা কি শিখতে চায়, কি শেখানো হচ্ছে অথবা কোন বিষয়ে তাদের বেশি আগ্রহ ও দক্ষতা সেসব দিকে নজর না দিয়ে অভিভাবকেরা ছুটছেন সন্তানের ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়া অথবা জিপিএ ফাইভ পাওয়ার পেছনে। ছেলেমেয়েদের সকাল শুরু হয় গাদা গাদা বই-খাতা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে কোচিং সেন্টারে বা স্কুলে পাঠানোর মধ্য দিয়ে। সরকারের পক্ষ থেকে শিশুদের দিয়ে অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগ বহনের নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা কেউ করছে না। তারপর রুটিন অনুযায়ী স্কুলের পড়াশুনা, গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে বসা, পরিবারের বড়দের কাছে পড়তে বসা, হোমওয়ার্ক করতে বসা ইত্যাদি। এভাবে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সন্তানদের নিমগ্ন থাকতে হয় পাঠ্যসূচির লেখাপড়ার গণ্ডির মধ্যে। এমনকি ছুটির দিন নির্ধারিত থাকে কয়েকটি টেস্ট পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। তাদের জীবন যেন বই-খাতা আর চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ। শিশুদের “প্লে” স্টেজে খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও তাদেরকে শিক্ষা দেওয়া হয় সপ্তাহে সপ্তাহে ক্লাস টেস্ট, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে। যেগুলোর ফলাফল দেওয়া হয় কঠিন সমীকরণে গঠিত গ্রেডিং পদ্ধতির মাধ্যমে। এমন কিছু প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশে আছে যেখানে শিশুদের প্রথম হাতেখড়ি শেখানোর কথা উল্লেখ থাকলেও ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম ক্লাসে ভর্তির সুযোগ নিতে হয়।

বিনোদন বলতে শিশুরা পাচ্ছে মোবাইল বা কম্পিউটারে ভিডিও গেইম খেলার সুযোগ, টেলিভিশন দেখা, ইউটিউব বা ইন্টারনেট ব্রাউজিং, গান শোনা ইত্যাদি যেগুলো প্রযুক্তি ও চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষার চাপ ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম, খেলাধুলা, সামাজিক মেলামেশা ইত্যাদি থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। যা তাদের মেধা ও শারীরিক বিকাশের অন্তরায়।

শিশুদের ওপর থেকে বাড়তি চাপ কমাতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা না রাখার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশনাটি আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম-আল-হোসেন। যা সময়োপযোগী ও প্রকৃত শিক্ষাবান্ধব সিদ্ধান্ত বলে মনে করি।

নতুন এই শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষকদের পরিচিত করার জন্য তাদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নমনীয় রাখতে হবে। যেহেতু পরীক্ষা থাকবে না সেহেতু ধারাবাহিক মূল্যায়ন করতে হবে এবং সেটি কিছুটা সংবেদনশীল, তাই মূল্যায়নের সময় শিশুদের উপর যেন কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে সে ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর প্রতি যেনো শিক্ষকদের স্বজনপ্রীতি না থাকে সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের খেয়াল রাখতে হবে। অভিভাবকরা যেনো শিশুদের প্রতি প্রতিযোগিতার মানসিকতা দূর করে শিশুদের নিজস্ব মেধা বিকাশের প্রতি গুরুত্ব দেয় সে ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া যায় সে আদলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এজাতীয় শিক্ষা পদ্ধতির বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে আমলে নিতে হবে।

সর্বোপরি চাইবো শিশুদের শিক্ষার পরিবেশ যেন আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধক্ষেত্র না হয়ে আনন্দের খেলাঘরে পরিণত হয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।