ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে এক ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর দগ্ধ ওই ছাত্রীর নাম নুসরাত জাহান রাফি (১৮)। গতকাল শনিবার সকালে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে আলীম পরীক্ষা শুরুর আগে এ ঘটনা ঘটে। দগ্ধ ছাত্রীর চিত্কারে সহপাঠী ও শিক্ষকরা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে সোনাগাজী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে দুপুরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, তার শরীরের ৮০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, কিছুদিন আগে ওই ছাত্রীকে শ্লীলতাহানি চেষ্টার অভিযোগে একই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন তার মা। ওই মামলার জের ধরে অধ্যক্ষের অনুগত শিক্ষার্থীরা এই হামলা করেছে বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার। এ ঘটনায় রাতে এক শিক্ষকসহ ২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে সোনাগাজী পুলিশ। ফেনীর পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ওই শিক্ষার্থী দগ্ধ হয়েছে। তবে কীভাবে এবং কারা ঘটিয়েছে-তা তদন্ত করা হচ্ছে। সোনাগাজীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহেল পারভেজ জানান, ঘটনা শোনার পরপরই ঘটনাস্থলে যাই। সেখান থেকে কেরোসিনের বোতল ও কিছু পলিথিন উদ্ধার করা হয়েছে।
আগুন দেওয়া চারজনই ছিল বোরকা পরা :ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাতকে নিয়ে আসেন তার বড় ভাই মাহ্মুদুল হাসান নোমান ও চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আলী। নোমান একই মাদ্রাসা থেকে ডিগ্রী পরীক্ষা দিয়েছেন। হাসপাতালে নোমান সাংবাদিকদের বলেন, তার বোন গতকাল সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসা কেন্দ্রে যায়। পরীক্ষার হলে প্রবেশের কিছুক্ষণ পর তার চার জন সহপাঠী তাকে ডেকে তিনতলা মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যায়। ওই চার জন সহপাঠী বোরকা ছাড়াও হাত মোজা পরিহিত ছিল। এছাড়া তাদের মুখমন্ডল ঢাকা ছিল। শুধু দুই চোখ অনাবৃত ছিল। তারা দাহ্য পদার্থ ছুড়ে নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। নুসরাত বাঁচার জন্য চিত্কার করলে শিক্ষক ও পরীক্ষার্থী এবং স্থানীয় লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করে শরীরের আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে সোনাগাজী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, পরে ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে প্রেরণ করলে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। নোমান আরো বলেন, সকালে পরীক্ষার জন্য তিনি বোনকে নিয়ে ওই মাদ্রাসা কেন্দ্রে গেলে কয়েকজন ছাত্র ও অফিস সহকারী মো. মোস্তফা তাকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে বাধা দেন। পরে তিনি বোনকে দিয়ে চলে যান।
নুসরাতের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আলী অভিযোগ করেন, গত ২৭ মার্চ ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা তার বোনকে কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এই মামলায় পুলিশ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে। অধ্যক্ষ এখন কারাগারে আছেন। ঘটনার পর থেকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করছেন। আরেকটি অংশ অধ্যক্ষের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করছেন। তিনি আরো বলেন, আমাদের ধারণা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করায় তার অনুগত কিছু ছাত্রী নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
নুসরাতের অডিও রেকর্ড
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দগ্ধ নুসরাতকে ভর্তি করার পর ওই ছাত্রীর একটি অডিও রেকর্ড সাংবাদিকদের হাতে এসেছে। রেকর্ডে ওই ছাত্রী বলেছেন, ‘সকালে আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান তিনি। মাদ্রাসায় পৌঁছলে এক ছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের উপর কেউ মারছে বলে ডেকে নেয়। সেখানে আরও চার-পাঁচজন মুখোশধারী ছাত্রী ছিলেন। তারা বলেন, প্রিন্সিপালের উপর যে অভিযোগ করেছিস তা মিথ্যা, বল। আমি বলি না, আমি যা বলেছি সব সত্যি। তারা বলে, তোকে এখনই মেরে ফেলবো। আমরা তোর সব খবর নিছি। তোর প্রেম সম্পর্কিত সব তথ্য আমাদের কাছে আছে। আমি বলি, আমি সব সত্য বলেছি। আমি শিক্ষকদের সম্মান করি, কিন্তু যে শিক্ষক আমার গায়ে হাত দিছে আমি তার প্রতিবাদ করেছি। সঙ্গে সঙ্গে তারা আমার হাত-পা চেপে ধরে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।’
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
ঘটনার সময় পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিন এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি মাদ্রাসার অফিস কক্ষে প্রশ্নপত্র পরীক্ষার হলে পাঠানোর জন্য তৈরি করছিলেন। হঠাত্ চিত্কার চেঁচামেচি শুনে বেরিয়ে এসে দেখেন অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় এক পরীক্ষার্থী, তাকে অন্য পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ধরাধরি করে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরে তিনি বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
কেন্দ্র সচিব নুরুল আফসার ফারুকি বলেন, ‘ঘটনা শোনার পর ছাদে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি নাইটগার্ড মোহাম্মদ মোস্তফা ও পুলিশ কনস্টেবল মোহাম্মদ রাসেল আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।’ তবে কীভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটলো সে ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারেননি।
এ ঘটনায় মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক-কর্মচারী কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মচারী জানান, অভিযুক্ত অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজ উদ দৌলা জামায়াতের একজন রুকন ছিলেন। এ ব্যাপারে ফেনী জেলা জামায়াতের আমীর মো. সামছুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজ উদ দৌলাকে বিভিন্ন অপকর্মের জন্য ২০১৬ সালে জামায়াত থেকে বহিস্কার করা হয়েছে, তিনি বর্তমানে আমাদের কোন সদস্য নন।
এদিকে মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষার্থী দাবি করছেন, সকাল ৯টায় ওই ছাত্রী আলীম পরীক্ষায় অংশ নিতে পরীক্ষা হলে আসে। হলে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর সে টেবিলে প্রবেশ পত্র ও কলম রেখে হল থেকে বের হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরে মাদ্রাসার ছাদে তারা চিত্কার শুনতে পায়। পরে জানতে পারে সেখানে গায়ে আগুন লেগে পুড়ে গেছে নুসরাত। তবে কীভাবে আগুন লেগেছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন তারা।
২ জন আটক
সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, ক্ষতিগ্রস্তের পরিবার থেকে জানানো হয় সন্ত্রাসীরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে। তাদের পরিবার থেকে মাদ্রাসার ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক আফছার এবং আলীম বিভাগের ছাত্র আরিফের নাম পুলিশকে জানালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। রাতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি বলেন, ঘটনাটি পুলিশ খুব গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে খতিয়ে দেখছে। এ ঘটনায় কে বা কারা জড়িত, তা তদন্ত করে বের করা হবে। তবে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তের পরিবার থেকে এখনও কোন মামলা হয়নি বলে তিনি জানান।
