চট্টগ্রাম নগরীতে ফুটপাত ভাড়া দিয়ে টাকা আদায় করছে তিন শ্রেণির মানুষ। অভিযোগ মতে, এরা হলেন ফুটপাতের পাশে থাকা দোকান মালিক, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ফুটপাত ভাড়া নিয়ে হকাররা বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। আর এ কারণে ফুটপাত দিয়ে পথচারীরা চলাচল করতে পারছেন না। তারা মূল সড়কে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এ চিত্র নগরীর বেশিরভাগ জায়গার।
নগরীর প্রতিটি প্রধান সড়কে দোকানের সামনে রয়েছে ফুটপাত; কিন্তু দোকানিরা ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণে দোকানের বাইরে ফুটপাতে তাদের পণ্য সাজিয়ে রেখেছেন। আবার অনেকে বাড়তি আয়ের লোভে নিজ নিজ দোকানের সামনের ফুটপাত হকারকে ভাড়া দিয়েছেন। নগরীর জুবিলী রোড, নিউমার্কেট এলাকা, আমতলা, আন্দরকিল্লা, মোমিন রোড, চকবাজার, আগ্রাবাদ, বন্দরটিলা, জিইসি মোড়, মুরাদপুর, একে খান গেট, অলংকার মোড়, ইপিজেড এলাকা, কর্ণফুলী সেতু এলাকাসহ ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে ফুটপাতজুড়ে এই দৃশ্য দেখা যায়।
নগরীর ব্যস্ততম বহদ্দারহাট মোড় দিন-রাত মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে। এখানে ফুটপাত এবং সড়কে নানা পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন হকাররা। একজন ফল বিক্রেতা জানান, ফুটপাতে বসে পণ্য বিক্রির জন্য তাদের প্রতিদিন বিভিন্ন পর্যায়ে ৭০০/৮০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। যার দোকানের সামনে বসেছেন তাকেও দিতে হয়।
এ ব্যাপারে চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল বাশার ইত্তেফাককে বলেন, স্থানীয় লোকজন ফুটপাতে বসে ব্যবসা করছে। এখানে যাদের স্থায়ী দোকান রয়েছে তারাই তাদের দোকানের সামনে ফুটপাতে হকাদের বসার সুযোগ দিয়েছে এবং ভাড়া নিচ্ছে। আমি কয়েকবার তুলে দিতে চেয়েছিলাম। এসব হকারের কাছ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে চাঁদা আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এত গভীরে আমি যাইনি।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ‘সবুজে সাজবে নগরী’ স্লোগানে বিভিন্ন সড়কের সৌন্দর্য বর্ধন করছে। প্রচুর অর্থ খরচ করে এ কাজ করা হচ্ছে; কিন্তু ফুটপাতে পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাহানারা ফেরদৌস ইত্তেফাককে বলেন, ফুটপাতে পথচারীর চলাচল বাধাগ্রস্ত করা নিয়ে আমরা অভিযান চালিয়ে থাকি। অভিযানকালে জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়া হলেও পরে ফুটপাত আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফুটপাত চলাচলের উপযোগী রাখতে হলে পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় কাউন্সিলর, নগরিকদের সচেতন হতে হবে। সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়।’
নগরীর জামালখান ওয়ার্ডের বিভিন্ন সড়ক সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে। এখানে প্রেসক্লাবের সামনে থেকে উত্তরে মোড় পর্যন্ত ফুটপাতে বসে আড্ডা দেওয়ার জন্য স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের উদ্যোগে ছোট ছোট অসংখ্য বেঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে দিনের বেলায় ও সন্ধ্যার পর থেকে বিভিন্ন বয়সী মানুষ বসে সময় কাটায়। ফুটপাতে বসার ব্যবস্থা করা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামসুদ্দোহা ইত্তেফাককে বলেন, ‘করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে স্থানীয় কাউন্সিলর তা করেছেন। এখানে কয়েকটি স্কুল রয়েছে। অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের স্কুলে নিয়ে আসেন। তাদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। ফলে তাদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে করপোরেশন বেঞ্চ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে। তবে এসবের মধ্যেও ফুটপাতে পথচারীর চলাচলের যথেষ্ট জায়গা রয়েছে।’
চট্টগ্রাম কলেজের প্যারেড মাঠ আধুনিকায়ন করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। মাঠের তিন পাশে প্রাচীরের বাইরে পথচারীদের জন্য ফুটপাত নির্মাণ করা হয়েছে; কিন্তু এই ফুটপাত দিয়ে চলাচল করা যায় না। ফুটপাত ঘেঁষে ও উপরে চলছে ইট বালুর ব্যবসা ও চায়ের দোকান। চন্দনপুরায় ফায়ার সার্ভিসের সামনে ফুটপাতজুড়ে রয়েছে নার্সারি। কর্ণফুলী সেতুর উত্তর পাশে ফুটপাতের উপর যাত্রীবাহী বাস রেখে যাত্রী উঠানামা চলছে। অপর পাশে ফুটপাতজুড়ে নানা পণ্যের দোকান। আর নিউ মার্কেট মোড় এলাকায় ফুটপাত পুরোপুরি হকারদের দখলে।
এ ব্যাপারে সিএমপি ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) হারুন অর রশিদ হাজারী ইত্তেফাককে বলেন, ‘ফুটপাত মুক্ত রাখতে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করে থাকি। দেখা যায় পরে আবার ফুটপাতে হকার বসে যায়। কিছু স্থানে দোকানের মালিকরা তাদের দোকানের সামনে ফুটপাতে হকার বসিয়ে দেয়। হকার থেকে দোকানিরা নিয়মিত ভাড়া আদায় করে। আবার ফুটপাতের বাইরেও ভাসমান হকার বসে পণ্য বিক্রি করছে। ফুটপাতে অবৈধ ভাবে বসে পণ্য বেচাকেনা বন্ধ করে পথচারীদের চলাচলের উপযোগী রাখার দায়িত্ব সিএমপির স্ব-স্ব থানার। তবে ফুটপাতে ব্যবসা বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।’
