বিধির খেলা

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:৫৮

শিমুল শাহিন

 

শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম, সোমার পিছনে অনেক ঘুরেছি, আর না! সোমাকে খুবই পছন্দ করতাম আমি, কিন্তু সে আমাকে কখনো পাত্তা দেয়নি! ওকে যখনই প্রোপোজ করেছি, বারবার সে একই কথা বলত, বন্ধুর সাথে প্রেম করতে পারবে না, বন্ধুকে বিয়ে করতে পারবে না! একই কথা শুনতে শুনতে আমিও বিরক্ত হয়ে গেছি! যদিও আমাকে এতবার রিফিউজ করার আসল কারণটা কী, তা কখনো বের করতে পারিনি! হতে পারে আমাকে তার পছন্দ না, কিংবা গোপনে হয়তো অন্য কাউকে পছন্দ করে!

আজকে ওদের বাসায় গিয়েছিলাম, অন্যদিনের মতো আজকেও তাকে ভালোবাসার কথাটাই বললাম! কিন্তু সে আগের মতোই না করে দিলো! রাগ হলো প্রচণ্ড, এভাবে আর কত! জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার সাথে প্রেম করতে তোর সমস্যা কী? আমি দেখতে খারাপ?’

‘আরে তা হবে কেন?’

‘তাহলে?’

‘তুই আমার বন্ধু...’

ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, ‘এটা ছাড়া অন্য কারণ থাকলে বল!’

‘কারণ তো আছেই, তোদের বাড়ি আর আমাদের বাড়ি একই গ্রামে—একই গ্রামে শ্বশুরবাড়ি হলে বিয়ের মজাটাই পাব না!’

‘কী সব ফালতু যুক্তি দিচ্ছিস তুই!’

‘অবশ্যই ফালতু যুক্তি না! তোর বাবা-মাকে আমি চাচা-চাচি ডেকে অভ্যস্ত, আমার শ্বশুর শাশুড়ি নিয়ে কত্ত প্ল্যান—সব ভেস্তে যাবে!’

সোমার এরকম ভিত্তিহীন অজুহাত শুনে পিত্তি জ্বলে গেল, ইচ্ছে করছিল ওকে বেশ কয়েকটা কঠিন কথা শুনিয়ে দিই! তবুও নিজেকে সংযত করে নরম স্বরে বললাম, ‘এতদিন তোর পিছে ঘুরেছি। বারবার নানা অজুহাতে আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিস! আজকেই শেষ! আর কখনো তোর সামনে আসব না, কখনো বলব না—তোকে ভালোবাসি! ভালো থাকিস তুই!’

কথাগুলো বলেই সোমাদের ঘর থেকে ছুটে সরাসরি আমার ঘরে এসে ঢুকলাম! মনটা বিষণ্ন হয়ে আছে, সিনেমা বা হাসির নাটক দেখলে মনটা কিছুটা ভালো হতে পারে ভেবে ল্যাপটপটা অন করলাম! ইউটিউবে ঢুকে একটা নাটক চালু করলাম, কিন্তু কিছুতেই মনস্থির করতে পারছিলাম না! নাটকটা থামালাম, কয়েকটা মিনিট ঝিম মেরে বসে থেকে শেষমেশ ঠিক করলাম, সোমা অধ্যায় আজকেই শেষ! রীতিমতো শপথ নিলাম, আর পিছনে ফিরে তাকাব না, নিজেকে একদম গুছিয়ে নেবো আজ থেকেই—এখন থেকেই! কিন্তু শপথ নেওয়ার পরপরই উপলব্ধি করলাম আমি নিজে যতটা অগোছালো তারচেয়ে কয়েক গুণ অগোছালো হয়ে আছে আমার ঘরটা! টেবিল, বিছানা, মেঝেজুড়ে পোশাক আর বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে! সিলিং ফ্যানটার গায়ে ধুলা-ময়লার আস্তর দেখে ভাবলাম নিজেকে গুছানোর আর নিজের ঘরটা গুছানোর কাজটা নাহয় ফ্যানটা পরিষ্কারের মাধ্যমেই শুরু করি!

যেই ভাবনা, সেই কাজ। পুরনো একটা গামছা দিয়ে শুরু করলাম সিলিং ফ্যান পরিষ্কারের কাজ! ফ্যানের কেবল একটা পাখা পরিষ্কার করেছি, ঠিক সেসময় ঘরের দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকল সোমা! আমাকে গামছাসহ এভাবে দেখেই সে চিত্কার করে বলল, ‘এ কী করছিস তুই! আমার জন্য আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিস? তুই আমাকে এত ভালোবাসিস বুঝিনি! প্লিজ নেমে আয় তুই। আই লাভ ইউ!’

কোনো রকমে হাসিটা চেপে রেখে ফ্যান মোছা বন্ধ করে নেমে এলাম বিছানা থেকে! মেঘ না চাইতেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বর্ষণ দেখে আসল ঘটনা বেমালুম চেপে গেলাম! দুটো চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসলাম দুজন! সোমা প্রথমবারের মতো ‘তুই’-কে ‘তুমি’-তে উন্নীত করে বলল, ‘কী ভাবছ তুমি?’

অট্টহাসিটা খুব কষ্টে আটকে রেখেছি মুখে! মুখে কিছু না বলে শুধু একটা মুচকি হাসি দিলাম! মনে মনে বললাম, ‘এ কি বিধির খেলা, আপনা আপনি পড়ল এসে কাকের গলায় তুলসী মালা!’

রাজশাহী।