আহাদ আদনান
এটাই তাহলে সিম-বাবার দরগা শরিফ? অনেক দিনের অপেক্ষার পর, তক্কে তক্কে খোঁজার পর, লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলাম মনে হচ্ছে। ধ্যান করার মতো ভান করে, কিন্তু কানটা টানটান খাড়া করে বসে আছি। এমন সময় হাতে এলো ‘মেন্যু কার্ড’। লোভনীয় সব আহার্য কার্ডে। পরীক্ষায় পাস :দশ হাজার টাকা, দুশ্চিন্তায় অনিদ্রা :বারো হাজার টাকা, প্রেমে ব্যর্থতা :পনের হাজার টাকা। বেশি দূর যেতে হলো না। আমার সমস্যা কমন পড়ে গেছে। বুকিং মানি জমা দেওয়ার পর ডাক পড়ল বাবার খাস কামরায়।
ছোট একটা ঘর। ধুপ আর গাঁজার ধোঁয়ার মিশ্র গন্ধ। অন্ধকার অন্ধকার ভাব। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে থেকে সিম-বাবা হাঁক দিলেন, ‘মেয়েটার কী নাম?’
আমি ভালো করেই জানি, মেন্যু কার্ডে বুকিং দেওয়ার সময়ই আমার সমস্যার কথা জেনে গেছেন তিনি, তবু মনে হলো বাবার কত আধ্যাত্মিক শক্তি! ভক্তিতে গদগদ হয়ে বললাম, ‘বাবা, আপনি আমার একটা গতি করে দেন। পাশের গ্রামের মর্জিনারে আমি অরজিনাল পেয়ার করি। কিন্তু সে আমারে থোড়াই কেয়ার করে। পকেটের টাকা খরচ করে তারে আমি রেয়ার রেয়ার দামি জিনিস গিফট করি, তবু সে বড়ই আনফেয়ার। তার হূদয়টা নাকি সে মজনুর সাথে শেয়ার করে বসে আছে। আমার জন্য কোনো চেয়ার খালি নাই। এখন আপনিই আমার শেষ ভরসা। মর্জিনারে ছাড়া আমি বাঁচব না বাবা।’
কিছুক্ষণ বাবার মুড ধরলেন, এরপর আমার তৈলমর্দনসহ কাকুতি-মিনতির পর ধার্য হলো আমার ব্যাপারটা বাবা দেখবেন। আমাকে তিনি একটা স্পেশাল সিম দিলেন। হাদিয়া মাত্র দশ হাজার টাকা (একটা সিমের দাম দশ হাজার টাকা, তাও আবার মাত্র)! খুশিতে টগবগ করতে করতে আমি পরবর্তী ‘ইনস্ট্রাকশন’সহ সিমটা নিয়ে বের হলাম। পঁচিশ হাজার টাকার প্যাকেজে মর্জিনারে পেয়ে গেলে মন্দ কী!
ইনস্ট্রাকশন এক ভরা পূর্ণিমায় নদীর তীরে বসে পাক শরীরে সিমটা মুঠোফোনে ঢোকাতে হবে। ঢোকালাম সিম।
ইনস্ট্রাকশন দুই-ছয়বার ‘সিম-বাবা জিন্দাবাদ’ বলে মর্জিনার নম্বরে কল দিতে হবে। দিলাম কল। একটা নারী কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে আপনার সংযোগটি এই মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।’ সিম-বাবাকে যথাসম্ভব গালাগাল করে রিচার্জ কার্ড জোগাড় করে সিমটা জ্যান্ত করে আবার কল করলাম মর্জিনার নম্বরে। আবার নারীকণ্ঠ, ‘আপনার কাঙ্ক্ষিত নম্বরে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। পরের ইনস্ট্রাকশনগুলোতে আর যাওয়ার দরকার পড়ল না।
সিম চালু রেখে আরও দুদিন চেষ্টা করেও মর্জিনার নাগাল পাওয়া গেল না। এদিকে অতি বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পাওয়া গেল, পাশের বাড়ির মফিজের হাত ধরে আগের রাতেই মর্জিনা পালিয়ে গেছে। পঁচিশ হাজার টাকার প্যাকেজ জলে গেল ভেবে আমি তো বোকা বনে গেছি। আম ছালা দুই হারিয়ে আমি আবার সিম-বাবার দরগায় যাব ঠিক করলাম। এবার তৈলমর্দন করতে নয়, বাঁশ প্রদান করতে।
ঠিক তখনই ‘কুদরতি’ সিমে একটা কল এলো। আমি তো অবাক। আবার এক নারী কণ্ঠ, কিন্নর কণ্ঠী বলা যায়।
‘কেমন আছ, জান’?
এই জন্মে আমাকে কেউ জান বলে ডাকেনি। খুশিতে চোখে পানি এসে পড়ল আমার।
‘এতদিন কোথায় ছিলে জান? তোমাকে ছাড়া আমার রাত কাটে না। সাত জনম পার হয়ে যায় সাত দিন দেখা না হলে। হাত দুটি না দিলে আমি ছাদ থেকে ঝাঁপ দিব জান।’
এরপরের সাতদিন চলল আমাদের ইঞ্চি ইঞ্চি নয়, মাইল মাইল প্রেম। মর্জিনার ছবি মনের ফ্রেম থেকে ডিলিট করে এই জানকে হূদয়ের এলিট ক্লাবে জায়গা করে দিলাম। শুধু কথায় প্রেম আর এগোয় না। ঠিক হলো একদিন সন্ধ্যায় নদীর তীরে কাশবনে আমাদের মিলন হবে।
বিকেলের মধ্যেই লাল পাঞ্জাবি পরে, মাঞ্জা মেরে আমি হাজির। একটু পরপর ফোন আসছে। ‘জান, তোমাকে না এক ঘণ্টা ধরে বলছি, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।’ আমি গুনগুন করে গান গাচ্ছি, ‘আমি কার জন্য পথ চেয়ে রব, আমার কী দায় পড়েছে।’ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এমন সময় পিঠে হাতের স্পর্শ, নরম নয় মোটেই, লোহার মতো শক্ত। ভারী পুরুষ কণ্ঠের অভিবাদন, ‘কেমন আছেন সিম-বাবা।’ মাথায় ধাতব আঘাত, আমি চিত্পটাং। এরপর থেকে আমি গুম, নিরুদ্দেশ। আমার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
(পুনশ্চ :কয়েকদিন পরের বিভিন্ন পত্রিকায় পাওয়া একটি খবর। দুর্ধষ জঙ্গি মকবুল গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক। এই জঙ্গি দীর্ঘদিন প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে ছিল। গোপন সূত্রে খবর পাওয়া যায়, সিম-বাবা নাম ধারণ করে সে নাকি ব্যবসাও ফেঁদেছিল। অনেকদিন আগের ব্যবহূত একটি সিম পুনরায় চালু করার পর পুলিশ তার নাগাল পায়। সেই সিমের সূত্র ধরে তাকে আটক করা হয়। বর্তমানে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কথিত ‘সিম-বাবার’ খপ্পড়ের শিকার বলে দাবি করছে। তবে পুলিশ দাবি করছে, তার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে এখন প্রকাশ হচ্ছে না। তবে খুব শীঘ্রই পুলিশ তাকে নিয়ে গোপন অস্ত্র এবং আস্তানার সন্ধানে বের হতে পারে।)
মাতুয়াইল, ঢাকা।
