ইকবাল খন্দকার
কিছু কিছু নীতিকথা আমরা সবসময় শুনে এসেছি। এরমধ্যে একটা হচ্ছে, কেউ খাবে কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না। তার মানে হচ্ছে, সবাইকে খেতে হবে। তবে এই কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশেষ করে ছন্দ মিলিয়ে যদি বলতে যান—কেউ পাবে কেউ পাবে না, তা হবে না, তা হবে না; তাহলে কিন্তু বিপদ। কারণ, এটাই সত্য যে, সবার পাওয়া সম্ভব না। তার মানে বাস্তবতা এটাই—কেউ পাবে, কেউ পাবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এখানে কী পাওয়া কথা বলা হচ্ছে? প্রশ্নের উত্তর—এখানে নমিনেশন পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এবার আপনিই বলেন, নমিনেশন কি সবার পাওয়া সম্ভব? এক আসন থেকে একই দলের আট-দশজন নমিনেশন ফরম কিনেছেন। সমান অধিকার বজায় রাখতে গিয়ে যদি সবাইকে নমিনেশন দিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ তৈরি করা হয়, তাহলে এই রেওয়াজ কেমন কেওয়াজ তৈরি করবে, একবার ভাবুন!
আমার এক প্রতিবেশী বললেন, ‘আমি তো মনে করি সবাইকেই নমিনেশন দিয়ে দেওয়া উচিত। এতে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।’ আমি বললাম, ‘এটা আপনি কী ধরনের কুপ্রস্তাব দিলেন? সবাইকে নমিনেশন দিয়ে দেওয়া উচিত মানে? আর এতে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটবে মানে?’ প্রতিবেশী বললেন, ‘আমি যা বলেছি, বুঝেই বলেছি। সবাইকে নমিনেশন দিয়ে দিলে হবে কী, এখন তো এক দলের প্রার্থী অন্য দলের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ভোট পাওয়ার জন্য ভোটারদের পিছনে খরচাটরচা করে। কিন্তু সবাইকে নমিনেশন দিয়ে দিলে যেটা হবে, একই দলের প্রার্থীদের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে যাবে। ভিন্ন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে হবেই। তার মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটারদের পিছনে খরচার পর খরচা। কে কত বেশি খরচ করে ভোটারদের মন জয় করতে পারবে, এই প্রতিযোগিতা। এতে হবে কী, ভোটাররা মোটামুটি বহুদিনের বিড়ি-সিগারেট সংগ্রহ করে ফেলতে পারবে। সাথে অন্যান্য খাবার-দাবার তো থাকবেই। এতে জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে না? আপনিই বলেন।’ আমি কিছুই বললাম না। চলে গেলাম দোকানের দিকে। গিয়ে শুনি সেখানেই এই টাইপের কথা হচ্ছে। বদরুল ভাই বলছেন, ‘একই দল থেকে একাধিক ব্যক্তিকে যে নমিনেশন দেওয়া হয় না, এটা খুবই ভালো একটা সিস্টেম। যদি দেওয়া হতো, তাহলে আমার লাউয়ের মাচার একটা খুঁটিও থাকত না।’ আমি বললাম, ‘একাধিক ব্যক্তির নমিনেশন পাওয়ার সাথে আপনার লাউয়ের মাচার খুঁটির কী সম্পর্ক?’ বদরুল ভাই বললেন, ‘বিরাট সম্পর্ক। কারণ, গতকাল দুই প্রার্থীর নেতা কর্মীদের মধ্যে যখন হাতাহাতি লেগে গেল, তখন তারা মনে করল শুধু হাতাহাতি করে পোষাচ্ছে না। লাঠি দরকার। ব্যস, রাস্তার পাশেই ছিল লাউয়ের মাচা। লাউয়ের মাচার বাঁশ খুলে একেকজনকে একেকজনের সে কী দৌড়ানি! চিন্তা করেন, যদি একাধিক প্রার্থীকে নমিনেশন দেওয়া হয়, তাহলে সারা মৌসুম বাঁশ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি হবে না? এত বাঁশের জোগান কে দেবে? আমি বাপু আমার লাউয়ের মাচার ওপর আর কোনো বিপদ ডেকে আনতে চাই না।’ আমার এক ছোট ভাই বলল, ‘আপনি জানেন কিনা জানি না, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পাস করতে না পারলেও কিন্তু ‘চেয়ারম্যান’ বা ‘মেম্বার’ উপাধি পাওয়া যায়। তার মানে দাঁড়িয়ে পড়লে সেটার একটা মূল্যায়ন জনগণ করে। আমার ধারণা, নমিনেশন ফরম কিনলে তারও একটা মূল্যায়ন জনগণ করবে। এমপি-টেমপি ডেকে ফেলতে পারে। তাহলে এই সুযোগ কেন হাতছাড়া করব।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তার মানে তুই নমিনেশন ফরম কিনেছিস? এত টাকা পেলি কোথায়?’ ছোটভাই বলল, ‘আপনি তো দেখছি এখনো বোকাই থেকে গেছেন। আরে ত্রিশ হাজার টাকা খরচ করে নমিনেশন ফরম কিনব কেন? আমার পরিচিত একজন কিনেছে। সেটা ফটোকপি করে নিয়েছি।’
