বিশ্বজিত্ দাস
‘চারদিকে এত অন্ধকার কেন? এ আমরা কোথায় এলাম রিসি?’ রিসি উত্তর দিল না।
‘কী হলো রিসি? আমরা কি পৃথিবীতে নেমেছি? না অন্য কোন গ্রহে?’ অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল ইপসাইলন। পুর্বিয়ান গ্রহের ভবিষ্যত্ কর্ণধার।
রিসি কোন কথা বলল না। পকেট থেকে বের করল এক ডিভাইস চালু করতে কিছুটা সময় লাগল।
‘কী হলো?’
‘স্যার। আমরা পৃথিবীতেই এসে নেমেছি।’
‘আমাদের তো পৃথিবীতেই আসার কথা কিন্তু এখানে প্রাণের কোনো সাড়া পাচ্ছি না কেন? আমরা কি মরুভূমিতে এসে নেমেছি?’
রিসি আবার তার ডিভাইসটি নাড়াচাড়া করল, ‘স্যার, আমরা পৃথিবী গ্রহের বাংলাদেশ নামের দেশে এসে নেমেছি।’
‘কাউকে দেখছি না কেন?’
রিসি একমনে তার ডিভাইসের ওপর আঙুল চালাতে চালাতে রিপোর্ট দিল, ‘স্যার এখানে এখন অনেক রাত। সবাই এখন বিশ্রাম নিচ্ছে। এটাকে ওরা ঘুম বলে।’
‘আমরা এখানে কেন এসে নামলাম? মহাকাশযানটা আমাদের ভুল জায়গায় নামায়নি তো!’
‘না স্যার। এখানে আর কয়েকদিন পরই জাতীয় নির্বাচন। প্রার্থীরা সবাই নিজ নিজ দলের পক্ষে ভোটে জেতার জন্য নানা রকম প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
‘হুম।’ ইপসাইলন শুধু মুখ দিয়ে একটা শব্দ করল। পুর্বিয়ান গ্রহতেও আর কয়েকদিন পরই ভোট। ইপসাইলন পৈতৃকসূত্রে গ্রহের রাজা হওয়ার দাবিদার। কিন্তু গ্রহের বেশ কয়েকজন সিনিয়র সিটিজেন দাবি করেছেন, বারবার পৈতৃক সূত্রে এক ফ্যামিলি থেকেই রাজা হবে—এটা ঠিক হচ্ছে না। তার চেয়ে ভোট হোক। গ্রহের বাসিন্দারা যাকে যোগ্য মনে করবে সেই হবে আগামী দুই বছরের জন্য রাজা।
সিনিয়র নাগরিকরা শুধু দাবিই করেননি, এই মতবাদের পক্ষে বেশকিছু সমর্থনও তারা জোগাড় করেছেন।
বাধ্য হয়ে ইপসাইলন তার প্রয়াত বাবার বন্ধু মিউয়ন চাচার কাছে পরামর্শ চাইতে গিয়েছিল।
‘মিউয়ন চাচা, ভোট তো দিয়ে দিলাম। কিন্তু মনে তো হচ্ছে না ভোটে জিতব।’
‘সবাই শুধু পরিবর্তন চায়।’ মাথা নেড়ে বললেন বৃদ্ধ।
‘আমাকেও যদি পরিবর্তন করে দেয়?’
‘হুম।’ চোখ বন্ধ করে বলেছিলেন মিউয়ন চাচা।
‘তুই একদিন বাংলাদেশে চলে যা। ভোটে জেতার নানান কলাকৌশল ওরা জানে। তুই গিয়ে একদিন সব জেনে আয়।’
ইপসাইলন বেশ ভেবেছে। বাংলাদেশ নামটা তার কাছে অপরিচিত নয়। রাজনীতি আর ক্রিকেট এই নিয়েই ওরা ব্যস্ত থাকে বেশি।
ইপসাইলন ঠিক করেছিল একদিন চুপ করে বাংলাদেশ ঘুরেই আসবে। তারই ফলে আজ ওরা দুজন মিলে চলে এসেছে বাংলাদেশে।
‘চলুন স্যার, সামনে এগিয়ে যাই। একটু পরই ভোর হবে।’
‘আমাদের মহাকাশযানটার কী হবে?’
‘ওটাকে স্যার এক্ষুনি লুকিয়ে রাখছি।’ রিসি যন্ত্রটার কলকব্জা ধরে কী সব করল। অমনি বৃহত্ যন্ত্রটা মুহূর্তের মধ্যে ছোট একটা বাক্সে পরিণত হলো। রিসি সেটাকে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।
দুজন মিলে এগোতে শুরু করল।
রাস্তার একটা মোড়ে এসে দাঁড়াল দুজন। রাস্তার অবস্থা বেশ নাজুক। পাশে একটা খাড়া দেয়ালের গায়ে কী সব লেখা।
‘এটা কী রিসি?’
রিসি তার ডিভাইসে সার্চ করল। ‘স্যার, এটা একটা ভিত্তি প্রস্তর। রাস্তা মেরামতের ভিত্তি প্রস্তর?’
‘রাস্তা মেরামত কী হয়ে গেছে? কে করেছে?’
‘রাস্তা মেরামত শুরুই হয়নি স্যার।’
‘কবে হবে?’
‘জানি না স্যার।’
‘আচ্ছা দাঁড়াও। ওই লোকটাকে জিজ্ঞেস করি।’
সকালবেলা নামাজ পড়তে যাচ্ছিল লোকটা। তাকে থামাল রিসি। ‘ভাই, বলতে পারবেন এই রাস্তা কবে ঠিক হবে।’
‘জানি না।’
‘এই যে এখানে একজন জনপ্রতিনিধি ভিত্তি প্রস্তর লাগিয়েছেন যে, রাস্তা মেরামত হবে, তবু বলতে পারবেন না কবে রাস্তা ঠিক হবে?’
‘আরে অমন ভিত্তি প্রস্তর তো অনেকগুলোই করেছে ওই জনপ্রতিনিধি।’
‘কেন?’
লোকটি সশব্দে হাসল। ‘আরে বোঝেন না, সামনে ভোট। জনগণের নাকের সামনে মূলা ঝুলিয়ে রাখল। ভোটে জিতলে রাস্তা মেরামত করবে, ব্রিজ বানাবে—আরও কত কী করবে?’
রিসি তার ডিভাইস দেখে বলল, ‘আপনাদের এখানে তো নদীই নেই, ব্রিজ বানাবে কেন?’
‘আরে জনপ্রতিনিধিদের ব্যাপার আপনার বোঝেন না! ওরা যেখানে টাকা আছে সেখানেই ওদের আগ্রহ বেশি।’
‘মানে।’ ইপসাইলন আর রিসি একসাথে জানতে চাইল।
‘মানে বুঝলেন না। আগে নদী কাটবে তারপর ব্রিজ বানাবে।’ হাসতে হাসতে চলে গেল লোকটা।
‘চলুন স্যার, সামনে এগিয়ে যাই।’ রিসি বলল।
‘আর না, রিসি। জলদি ফিরে চল পুর্বিয়ান গ্রহে।’
অবাক হলো রিসি, ‘কেন স্যার?’
‘কীভাবে ভোটে জিততে হবে বুঝে গেছি।’
‘কীভাবে?’
‘ফিরে গিয়ে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত আমি শুধুই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করব। পাবলিককে বুঝিয়ে দেব, আমাকে ভোট দিলে কী কী বানিয়ে দেব আমি ওদের জন্য।’
‘সত্যি বানাবেন স্যার?’
‘আগে ভোটে তো জিতি। ভোটে জেতার জন্য ভিত্তিপ্রস্তরই হল আমার একমাত্র ট্রাম্প কার্ড। জলদি চল।’ g
