চলতি ভাষার জন্য ঋণী আমরা শরত্চন্দ্রের কাছে, আর সাধুভাষার মধ্যে বারেবারে পথ হারিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছি বঙ্কিমচন্দ্রে। ভারতের পশ্চিমবাংলার নৈহাটির কাঁটালপাড়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কেমন নস্টালজিক লাগছিল। মনে হচ্ছিল বিপ্লবী কণ্ঠে যিনি ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি তুলে দিয়েছেন, যিনি প্রথম বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের জন্ম দিলেন, যিনি কমলাকান্তের মতো চরিত্রের অবয়ব গাঁথলেন, তিনিই ১৮৩৮ সালের ২৬ জুন এই বাড়িতেই জন্মেছেন। ভবিষ্যতের কপালে সেদিন যেন লেখা হয়ে গিয়েছিল, তাঁর হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যের সলতে পাকানো হবে।
গেলাম বঙ্কিমচন্দ্রে বসতবাড়ির দক্ষিণদিকে শিবমন্দিরের পাশে অবস্থিত বঙ্কিমভবন গবেষণা কেন্দ্রের কিউরেটর গৌতম সরকারের কাছে। তিনি বললেন, উনিশ শতকে বাংলার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলির মধ্যে অন্যতম এই চট্টোপাধ্যায় পরিবার। এঁদের আদি নিবাস ছিল হুগলি জেলার শিয়াখালার কাছে চণ্ডীতলায় দেশমুখো গ্রামে। যেখানে বসে কথা বলছিলাম গৌতমবাবুর সঙ্গে, বর্তমানে এটি বঙ্কিম সংগ্রহশালা। সম্ভবত ১৮৬৬-৬৭ সালে বঙ্কিমচন্দ্র পিতৃদত্ত এই জমিতে চার কামরার একটি বৈঠকখানা বাড়ি তৈরি করেন। এই বৈঠকখানা ঘরেই ‘বঙ্গদর্শন-এর সম্পাদনা। সেই সময় এই বাড়িতে ছুটির দিনে মজলিশি আড্ডার মধ্যমণি হতেন বঙ্কিম। সঙ্গে থাকতেন তাঁর মেজোদাদা সঞ্জীবচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র, নবীনচন্দ্র সেন, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ স্বনামধন্য সাহিত্যিক। স্বাধীনতার বীজমন্ত্র ‘বন্দেমাতরম’ গান রচনার সাক্ষীও এই বাড়ি। শোনা যায়, এই গানের সুর সংযোজন করেছিলেন যদুভট্ট। সূতিকাগৃহ, বঙ্কিমের শয়নকক্ষ, লেখার ঘর, বঙ্কিম ব্যবহূত কাঠের আলমারি, দাবা খেলার ঘুঁটি, বঙ্কিমের মাথার পাগড়ি, বঙ্কিম পরিবারের সংগীতশিক্ষার স্বরলিপি খাতা, ‘আনন্দমঠ’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ, বঙ্গদর্শনের গ্রাহক পাঠকদের চিঠি, ‘নীলদর্পণ’-এর আখ্যানপত্র, বঙ্কিমচন্দ্রের নানা চিঠিপত্র, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির বিদ্বান সমাগমের আমন্ত্রণপত্রসহ আরো অনেককিছুই নৈহাটির এই ভদ্রাসন ও বৈঠকখানা ঘরে সংরক্ষিত আছে।
পড়ন্ত বিকেলে সাহিত্যসম্রাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নৈহাটি স্টেশনের দিকে যেতে যেতে মনে পড়ল,— ‘কেননা সম্মুখে প্রকাণ্ড প্রান্তর, কী জানি, যদি কালধর্ম্মে প্রদোষকালে প্রবল ঝটিকা-বৃষ্টি আরম্ভ হয় তবে সেই প্রান্তরে নিরাশ্রয়ে যত্পরোনাস্তি পীড়িত হইতে হইবেক। প্রান্তর পার হইতে না হইতেই সূর্য্যাস্ত হইল, ক্রমে নৈশগগন নীলনীরদমালায় আবৃত হতে লাগিল...’ ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসের এই কথাগুলি।
