মোদি-মমতার তীব্র বাগযুদ্ধ কী বলছে দেয়ালের ভাষা?

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৪৪

আরশিনগর g বাহার উদ্দিন

‘চৈত্রদিনের তপ্ত বেলায়’ বাংলা, পশ্চিমবাংলা নরেন্দ্রভাই মোদিকে ‘দিল আঁচল পেতে’ স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে, সাড়ম্বর ভাবাবেগে— একথা বলা যাচ্ছে না। বরং আমরা বলতে পারি, মেঘের খেলায় জাগিল মরীচিকা। কেন একথা বলছি, তা জানানো একটু জরুরি মনে হচ্ছে। বুধবার দুপুর একটায় শিলিগুড়ির কাওয়াখালি মাঠে আর বিকেলে কলকাতার ব্রিগেডে, প্রথম দফা লোকসভা ভোটের ৮ দিন আগে, আড়াই ঘণ্টার ব্যবধানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে জনসভা করে গেলেন, সেটা তাকে হয়ত ‘বিস্মিত' করেছে, হয়ত সভার শরীরি ভাষায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নৌকাডুবির কষ্টকল্পিত ছবি দেখতে পেয়েছেন, কিন্তু তার দায়সারা শ্লেষাত্মক ভাষণের পুনরাবৃত্তিতে তার দলীয় সমর্থকদের কতটা প্রাণ জুড়াল, তা অস্পষ্ট হয়ে রইল। বাঙালির আবেগ ছুঁতে, বক্তৃতার শুরুতে বাংলায় টুং টাং আওয়াজ তুললেন বটে, কিন্তু এ পরশ মৃদুবায়ু সরিয়ে কতটা ঝড়ো হাওয়া তুলল বা তুলবে—এরকম ছবি এখনও অধরা। বিজেপি নেতারা সগর্বে বলেছিলেন, শিলিগুড়িতে অন্তত ১০ লাখ লোক হবে, সভা জনসমুদ্র হয়ে উঠবে। হলো কি? দু’সপ্তাহের টানা প্রচার-প্রস্তুতির পরেও, চারপাশের জেলা থেকে, বিহার থেকে সমর্থকদের জড়ো করেও মাঠ ভরে উঠল না।

কলকাতার ব্রিগেডেও প্রত্যাশা অপূর্ণ। জার্মান হ্যাঙ্গারের এগজিবিশন, দলীয় কর্মী—সমর্থকদের নিয়ন্ত্রিত উচ্ছ্বাস, তাদের উচ্চাশা আর বাংলা দখলের স্বপ্নকে কতটা ভরাট করবে, আদৌ কি করতে পারে, সভা শেষ হতেই এই প্রশ্ন হাওয়ায় লোকমুখে উড়ছে।

উত্তরবঙ্গের দিনহাটার সংহতি ময়দানে একইদিনে মমতাও যে পাল্টা জনসভা করলেন, মাত্র দু’দিনের প্রস্তুতিতেই, তা বাংলার রাজনৈতিক স্থিতিকে বহাল রাখার অঙ্গীকার ঘোষণা করল। জানিয়ে দিল  সৌহার্দ্য ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখতে সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। গণতন্ত্রের ‘খোলা হাওয়া লাগিয়ে প্রাণে’ সে ডুববে না জেগে উঠবে অন্য ভাষায়, নির্বিশেষের প্রতিরোধ আর প্রতিবাদকে সঙ্গে নিয়ে। বুকে জড়িয়ে।

প্রধানমন্ত্রী দুই সভায় কী বলেছেন, বৈদ্যুতিক প্রচার মাধ্যমের দৌলতে সেদিন সারা দেশ, সারা দুনিয়া দেখে নিয়েছে। তবু তার শ্লেষ, ভোটের ইস্যু, আমিত্বময়তা খানিকটা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। শিলিগুড়িতে যা বলেছেন, কলকাতায়ও প্রায় একই বক্তব্যের পুনরুক্তি আমাদের শুনতে হলো। ভোটের সময় এরকম হয়েই থাকে। একই ধরনের শব্দ, বাক্য, বয়ান বারবার ফিরে আসে। হ্যাঁ নির্দিষ্ট ইস্যু থাকলে জায়গা ও সময়ভেদে তা বদলে যায়। বাংলায় প্রচারে এসেই মোদির টার্গেট প্রধানতম মমতা, মমতার ফেডারেল জোট এবং সর্বভারতীয় কংগ্রেস। বললেন, ১: গরিবকে টাকা দিয়েছি, ঘর দিয়েছি, শৌচাগার দিয়েছি, বাংলায় এ বিকাশের চেহারা নেই। কারণ এখানে দিদি নামে একজন স্পিডব্রেকার আছেন। তাকে সরাতে হবে, না হলে বিকাশ হবে না। ২: বালাকোটে জঙ্গিদের ঘরে ঢুকে মেরে এল আমাদের ফৌজ। এতে ইসলামাবাদ যত না কাঁদল, জঙ্গি দরদে দিদি আর বিরোধীরা তার চেয়ে বেশি কাঁদলেন। ৩: পিসি-ভাইপো মিলে বাংলার সম্পদ লুটছেন। ৪:বেছে বেছে অনুপ্রবেশকারীদের দেশছাড়া করব। তবে গোর্খাদের চিন্তার কারণ নেই। তাদের নিরাপদে থাকতে দেব। ৫: এন আর সি নিয়ে অপপ্রচার হচ্ছে।

মোদি যা বললেন না, তা হলো, কাশ্মীরের পুলওয়ামায় জঙ্গি সন্ত্রাসে নিহত জওয়ানদের জন্য ভারতের জনতা, ভারতের সব দল, সব সম্প্রদায় এক হয়ে কেঁদেছে, মমতা মিছিল করেছেন, বালাকোটের সার্জিক্যাল স্ট্রাইককেও হেয় করেননি, সেনা অভিযানকে বিশেষ কোনো দল বা ব্যক্তির কৃতিত্ব বলতে চাননি। সেনাবাহিনীকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে চেয়েছেন। মমতাকে উন্নয়নের স্পিড ব্রেকার বলে মোদি সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে গেলেন—গ্রাম বাংলার উন্নয়ন। কৃষির উন্নয়ন। রাস্তাঘাটের সুপরিকল্পিত উন্নয়ন। এন আর সি-র নৈরাজ্যে আসামে বাংলাভাষীদের হয়রানি, আত্মহত্যা, হত্যা নিয়ে তার নীরবতা আবার প্রকট হয়ে উঠল, এ প্রকটতাকে গভীরতর কটাক্ষ বানিয়ে দিল অনুপ্রবেশ নামক জুজু নিয়ে তাঁর দলের অতিরঞ্জিত অবস্থান— যা শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, সত্যও নয়।

দিনহাটার সভা থেকেই মোদিকে জবাব দিতে তৈরি ছিলেন মমতা। পরনে নীল পাড়ের সাদা শাড়ি। পায়ে সেকেলে চপ্পল। মুখে ঝাঁঝালো ভাষা, যা তাঁর মজ্জাগত। হাতে মাইক্রোফোন। সামনে উচ্ছ্বসিত থইথই জনতা। জনমুখী নেত্রী বিজেপির একক হ্যাভিওয়েটের উদ্দেশে বলে গেলেন, ‘দেশে এবার ভোটার স্ট্রাইক আসন্ন। ছাপান্ন ইঞ্চি ছাতি নিয়ে উনি ৫৬০ ইঞ্চি অসত্য নিরন্তর শুনিয়ে যাচ্ছেন। সামান্য শিষ্টাচার নেই। তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বলতে লজ্জা হয়। মোদিবাবুকে এবার থেকে এক্সপায়ারি বাবু বলে ডাকব। এয়ার স্ট্রাইকের কথা আওড়াচ্ছেন? ভোটার স্ট্রাইক দেখেছেন? অসত্য বলার জন্য মানুষ এবার আপনাদের ভারতছাড়া করবে। বাংলাকে আপনি চেনেন না, পারলে লোকসভা ভোটে একটি আসন জিতে দেখান। লুটের টাকায় ব্রিগেডে হ্যাঙ্গার টাঙিয়ে সভা করেছেন। মে মাসের পরে ওই  হ্যাঙ্গারেই ঢুকে পড়তে হবে। ওঁদের থেকে দেশপ্রেম শিখতে হবে? উন্নয়ন শিখতে হবে? অসমে এন আর সি করে ৪৫ লক্ষ মানুষকে বাদ দিয়েছেন। বাংলায়ও নাগরিকপঞ্জি করার হুমকি দিচ্ছেন। অনুপ্রবেশকে ইস্যু করছেন। এত সস্তা? আমাকে উন্নয়নের স্পিড ব্রেকার বলছেন। আমাদের সরকার ১০০ দিনের কাজে এক নম্বর, কৃষিতে পাঁচবার পুরস্কার পেয়েছেন। রাস্তা নির্মাণ, গ্রামীণ আবাসনে আমরা কেন্দ্রের রেকর্ডে এক নম্বর। মহিলাদের ক্ষমতায়নে, কন্যাশ্রীতে দেশের সেরা। এ কৃতিত্ব বিশ্বে স্বীকৃত।’

একইদিনে তিনসভায় মানুষ কি শুধু দুই হ্যাভিওয়েটের বাগযুদ্ধ দেখল? মনে হয় না। দেখতে পেল, যাচাই করল এক জনমুখী নেত্রী আর জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীর কথাযুদ্ধের জয়-পরাজয়।

দু’জনের সভা শেষ হতেই আমাদের কলকাতায়, শহরের আশপাশে বেরিয়ে পড়ি। সন্ধ্যার আড্ডা, পথ চলতি মানুষের কথাবার্তা, রাজনৈতিক দলগুলোর বিশ্লেষণ লক্ষ করতে থাকি। বোঝার চেষ্টা করি, প্রধানমন্ত্রীর জনসভা কী কী প্রভাব ফেলল? মমতার জবাবকে সাধারণ মানুষ কী চোখে দেখছে? বিমানবন্দরমুখী ইস্টার্ন বাইপাস থেকে আমাদের শুরু। শেষ হলো ১২টায়। কলকাতাকে বড্ড নির্লিপ্ত, জড়সড় ঠেকল। রাস্তায় ভিড় নেই। যানজট নেই। পার্কস্ট্রিট রাত আটটায় সুনসান। ভোট নিয়ে আলাপ নেই। অধিকাংশ রেস্তোরাঁ স্তব্ধ, শূন্য আসন। খদ্দের নেই। পার্কস্ট্রিটের ভেতরে, ফ্রিস্কুল স্ট্রিট ছাড়িয়ে অলিগলিতে ভিন্ন চিত্র। অনেকেই জানালেন, বিজেপির সভার ধারেকাছে যাইনি। বাড়িতে বসেই মোদিকটাক্ষ শুনেছি। টিভিতে। দিদির পাল্টা জবাব লাজবাব। দিদি দিদিই। ফ্রিস্কুল স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, শ্যামবাজার উল্টোডাঙ্গা হয়ে সোজা এয়ারপোর্ট লাগোয়া কৈখালিতে। রাত তখন সাড়ে নটা। মিশ্র বসতি এলাকা। কেউ কেউ সরাসরি বললেন, মোদির সভায় ভিড় হয়েছে। সব জেলা থেকে লোকজন এসেছেন। কিন্তু সভায় যখন প্রধানমন্ত্রী স্লোগান তুললেন, তুলতে বললেন, তখন একদল কেবল ‘মোদি মোদি’ বলে গেল, কিন্তু সবার মিলিত স্বরে তাঁর একক স্লোগানের প্রতিধ্বনি কোথায়?

কৈখালি থেকে ফিরছি। রাত বাড়ছে। গাড়ি থামিয়ে রাতের কলকাতাকে দেখছি। দেওয়াল-লেখা পড়ছি। উত্তর থেকে দক্ষিণ, প্রাচীরের অক্ষরে সি পি এম, কংগ্রেস বিজেপি কারো বিশেষ কোনো চিহ্ন নেই। ছায়া নেই। প্রায় সবকটা দেওয়ালেই রাতের নীরবতাকে ছাপিয়ে কেবল বেড়ে উঠছে তৃণমূলের ঘাসফুল, হাসছে মমতার মুখচ্ছবি, দলীয় প্রার্থীদের নাম আর ৪২ আসন দখলের সংকল্প। দেওয়ালচিত্র অনেক সময় ভোটের আগাম ইঙ্গিত দেয়। শহরে, মফস্বলে, গ্রামে বাংলার ভোটারের ঝোঁক কোনদিকে, তা দেওয়ালের ভাষায় কি খুব অস্বচ্ছ? যদি না হয়, তাহলে বিজেপির সেনা প্রধানের প্রথম প্রচার সফর আগামী এক সপ্তাহে কী রকম, কোথায় কোথায় প্রভাব ফেলবে, কোন ধরনের মেরকরণ তৈরি করবে, বোঝা দুষ্কর। তবু আমরা পরের লেখায় কয়েকটি সমীক্ষা, বিজেপি নেতাদের দাবি এবং ১৪ সালের নির্বাচনের হিসেব-নিকেশ পেশ করে জানার চেষ্টা করব, সত্যি কি বি জে পি’র আসন বাড়বে? না তৃণমূলের একচ্ছত্র জয় অবশ্যম্ভাবী?

n লেখক:ভারতীয় সাংবাদিক। সম্পাদক, ‘আরম্ভ’