আলজেরিয়ায় ‘বুতেফলিকা অ্যালার্জি’!

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৯, ২২:২৭

 

আলজেরিয়ার ‘জীবন্ত লাশ’ প্রেসিডেন্ট বুতেফলিকা বিদায় নিয়েছেন। মনে হতে পারে খেলা শেষ। কিন্তু না। খেলা যেমন শেষ হয়নি, বিক্ষোভও তেমনি থামেনি। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখনো চলছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষতির সঙ্গে আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে প্রচুর। বিক্ষোভকারীদের দাবি, ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্টের পদত্যাগেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। তার অনেক সাঙ্গপাঙ্গরা এখনো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। তারাও ক্ষতির কারণ হতে পারেন গণতন্ত্রের জন্য। বিদায় নিতে হবে তাদেরকেও। বিশ্লেষকদের মতে, আলজেরিয়ায় ‘বুতেফলিকা অ্যালার্জি’ দেখা দিয়েছে। তাইতো তার সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন কাউকে সরকারে দেখতে চায় না জনতা। কারণ একজন মানুষের বিদায়েই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না।

 

যেভাবে বিদায় বুতেফলিকার

দুই সপ্তাহ আগেও বুতেফলিকা পঞ্চমবারের মতো নির্বাচনে লড়াই এবং একইসঙ্গে পদত্যাগ না করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু বিক্ষোভ এত চরম মাত্রায় পৌঁছেছিল যে, তিনি ঘোষণা করেন ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় নির্বাচন স্থগিত করা হবে। কিন্তু তাতেও বিক্ষোভ থামেনি। এরপর তিনি জানান, ২৮ এপ্রিল মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করবেন। তার এই ঘোষণা যেন বিক্ষোভে ঘি ঢেলে দেয়। চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করে। হস্তক্ষেপ করতে হয় সেনাবাহিনীকে। প্রেসিডেন্টের খুবই             ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সেনাপ্রধান এবং একইসঙ্গে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ গায়াদা সালেহ চাপ সৃষ্টি করেন। তবে সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের পদত্যাগকে তিনি গুরুত্ব দেন।

পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ‘কাউন্সিল অব দ্য নেশন’কে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগের আহবান জানান তিনি। এই অনুচ্ছেদে আছে, প্রেসিডেন্ট যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন তাহলে ন্যাশনাল কাউন্সিলের প্রধান প্রেসিডেন্ট পদে বসবেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন করবেন। এরপর উচ্চকক্ষ বুতেফলিকাকে অক্ষম ঘোষণা করে এবং কাউন্সিলের প্রধান আব্দেলকাদের বেনসালেহ অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। বেনসালেহের নজরদারিতে প্রধানমন্ত্রী নুরেদ্দিন বেদৌই নৈমিত্তিক কাজ সম্পাদন করবেন। তাই অবশেষে গত ২ এপ্রিল বুতেফলিকা প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ান। কাউন্সিল এবং পরবর্তীতে পার্লামেন্ট তার পদত্যাগপত্র অনুমোদন করে। ২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরু হওয়ার পর পঞ্চম কোনো প্রেসিডেন্ট বিক্ষোভের মুখে বিদায় নিতে বাধ্য হলেন।

 

বুতেফলিকা অ্যালার্জি

বুতেফলিকা চলে গেলেও ২০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা তার প্রশাসন রয়ে গেছে। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং প্রধানমন্ত্রী পদে তার অনুসারীরাই আছেন। জানা গেছে, বিদায়ের আগে প্রেসিডেন্ট বুতেফলিকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেনাপ্রধান সালেহ তাকে সেই সুযোগ দেননি। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রেসিডেন্ট সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবেন যা দেশকে আরো অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। আলজেরিয়ায় কেবল সেনাবাহিনীই ক্ষমতাশালী কিংবা তারাই কেবল সরকারের অংশিদার নন। গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারা, সম্পদশালী বা ধনিক শ্রেণি এবং সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তারা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আইন-কানুন বা রীতিনীতি তৈরি করেছেন। বিক্ষোভকারীরা এদের সকলের অপসারণ চায়।

বিবিসির স্যালি ন্যাবিল জানান, বুতেফলিকার পদত্যাগে সবাই সন্তুষ্ট নন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিক্ষোভরত এক নারীর কথায়। তিনি বলেন, এই বিক্ষোভ হচ্ছে যুবক-যুবতীদের নিয়ে যারা বুতেফলিকা ছাড়া অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট পাননি বা দেখেননি। তারা তার প্রতি সন্তুষ্ট নন। আবেগের সুরে ওই নারী বলেন, আমরা এই শাসন নিয়ে বিরক্ত। তারা সবকিছু ডাকাতি করেছেন।

তার মতে, জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নীচে যাদের বেশিরভাগ বেকার এবং দরিদ্র অবস্থায় আছেন। তবে কেবল তরুণ-তরুণীরাই নয়, অনেক বয়স্ক মানুষকেও বিক্ষোভে দেখা গেছে। তাদের একটাই বার্তা: ‘নতুন ধাপে নতুন মুখ’। অর্থাত্ বুতেফলিকার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে এমন কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। কারণ তাদের কাউকে জনগণ বিশ্বাস করে না।

 

বুতেফলিকার উত্থান

আলজেরিয়ার বর্ষীয়ান যোদ্ধা বুতেফলিকা। তিনি ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে এক দশকের বেশি সময় ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম দুই মেয়াদে তিনি জনগণের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে ৯০-এর দশকে গৃহযুদ্ধের পর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। ওই যুদ্ধে প্রায় দুই লাখ মানুষের প্রাণ যায়। বুতেফলিকা ২০০৯ এবং ২০১৪ সালেও বড় ধরনের জয় পান, যদিও বিরোধীরা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালে স্ট্রোক করার পর তাকে আর প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি। অনেক অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতিতে ছবি রাখা হতো। তার জীবিত থাকার বিষয় নিয়েও সরকারকে বিবৃতি দিতে হয়েছে। তাইতো জনগণ ৮২ বছর বয়সী বুতেফলিকাকে ‘জীবন্ত লাশ’ হিসেবে সম্বোধন করতো।