হতাশার অন্ধকারে অন্যরকম এক আশার আলো ছড়াইয়া না ফেরার দেশে চলিয়া গেলেন ফায়ারম্যান সোহেল রানা। সত্যি সত্যিই কি তিনি চলিয়া গেলেন— এই প্রশ্ন আমাদের পথ রোধ করিয়া দাঁড়ায়। সব সময় সকল মৃত্যুর ক্ষেত্রে এমনটি হয় না। কখনো কখনো কোনো কোনো মৃত্যু আমাদের গভীর গভীরতর দ্বন্দ্বে ফেলিয়া দেয়; যেমন দিয়াছেন সোহেল রানা। কীভাবে আমরা এই সত্য অস্বীকার করিব যে শারীরিকভাবে তিনি চলিয়া গিয়াছেন বটে, কিন্তু প্রবলভাবে তিনি আছেন আমাদের চেতনায়, ভালোবাসায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, ‘নয়নসম্মুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।’ মানুষের অমরত্বের বাসনা তথা অন্যের হূদয়ে বাঁচিয়া থাকিবার আকুলতা চিরায়ত হইলেও সকলের সেই সৌভাগ্য হয় না। যাহাদের হয় তাহাদের আমরা বীর বলি কিংবা ভূষিত করি অন্য কোনো বিশেষণে। বীর আমরা তাহাকেই বলি— যাহাকে লইয়া গোটা জাতি বা মানবকুল গর্ব করিতে পারে। অকালপ্রয়াত সোহেল রানা নিঃসন্দেহে সেই পর্যায়ভুক্ত। তিনি চলিয়া গিয়াছেন, কিন্তু যেই বার্তাটি রাখিয়া গিয়াছেন চরম ভোগবাদিতা ও আত্মসর্বস্বতায় নিমজ্জমান বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় তাহার চাইতে মূল্যবান আর কিছু নাই। কী সেই বার্তা? কালোত্তীর্ণ সেই বার্তাটি হইল, ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী ’পরে/সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’ বলা বাহুল্য, ইহাই হইল শাশ্বত মানবতার বাণী।
গত ২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারে সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী আগুনে আটকাইয়া পড়া মানুষের জীবন বাঁচাইতে গিয়া গুরুতর আহত হইয়াছিলেন ফায়ার সার্ভিস কর্মী সোহেল রানা। রাজধানীর কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের এই তরুণ ফায়ারম্যানের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার চৌগাংগা গ্রামে। ২০১৫ সালে তিনি ফায়ার সার্ভিসে যোগ দিয়াছিলেন। আগুনের লেলিহান শিখা ও আগ্রাসী ধোঁয়ার আতঙ্ক অগ্রাহ্য করিয়া সহকর্মীদের লইয়া ২৩ তলা ওই ভবনে অবরুদ্ধ বিপন্ন মানুষগুলিকে ল্যাডারের মাধ্যমে নিচে নামাইয়া আনার মরণপণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন তিনি। সকলেই জানেন, তাহাদের এই দুঃসাহসী ভূমিকার কারণে বহু জীবন রক্ষা পাইয়াছে। কিন্তু সোহেল রানা নিজেকে রক্ষা করিতে পারেন নাই। গুরুতর আহত নিবেদিতপ্রাণ এই ফায়ারম্যানকে বাঁচাইবার যথাসাধ্য চেষ্টা হইয়াছে। একপর্যায়ে চিকিত্সকদের পরামর্শক্রমে উন্নত চিকিত্সার জন্য পাঠানো হইয়াছে সিঙ্গাপুরে। কিন্তু সকল চেষ্টাই বিফলে গিয়াছে। তবে বিফলে যায় নাই সোহেল রানার আত্মদান। একটি জীবনের বিনিময়ে শুধু যে অনেকে নূতন জীবন পাইয়াছেন তাহাই নহে, তাহার এই বীরোচিত আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে অন্যদেরও পরার্থপরতার মন্ত্রে দীক্ষিত ও উজ্জীবিত করিবে। তবে এই প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, কিছু মানুষের সীমাহীন লোভ ও দায়িত্বহীনতাই যে এতগুলি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী— রূঢ় কঠিন সেই বাস্তবতাকে এড়াইয়া গিয়া আমরা মৃত্যুকেই মহীয়ান করিয়া তুলিতেছি কিনা। ইহার উত্তরে আমরা সেই পুরনো কথাটিরই পুনরুক্তি করিব দ্ব্যর্থহীন ভাষায়। যেই জাতি বীরের মর্যাদা দিতে জানে না, সেই জাতিতে বীরের জন্ম হয় না। দেশ-কাল ও বাস্তবতা নির্বিশেষে সোহেল রানার আত্মত্যাগ অকুণ্ঠ প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি আমাদের সত্যিকারের বীর। বীরের মৃত্যু নাই।
