তৈরি পোশাক উত্পাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর নতুন নেতৃত্বে আসছেন রুবানা হক। নবনির্বাচিত পরিচালকদের ভোটে আগামী ১২ এপ্রিল তিনি পরবর্তী সভাপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। তিনিই হবেন বিজিএমইএর প্রথম নারী সভাপতি।
তিনি দেশের খ্যাতনামা শিল্প প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সহধর্মিণী। আনিসুল হকও বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়েরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় এবারে বিজিএমইএর নেতৃত্বে এলেন রুবানা হক। বুদ্ধিদীপ্ত ও আত্মপ্রত্যয়ী আজকের রুবানা হক টিভি উপস্থাপক হিসেবেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন। ছাত্র জীবনে ছিলেন বিতার্কিক। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে করা বিবিসির ১শ নারী নিবন্ধে তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০৬ সালে তিনি কবিতার জন্য সার্ক সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
সোমবার রাজধানীর নিকুঞ্জে মোহাম্মদী গ্রুপের অফিসে গার্মেন্টস শিল্প ও বিজিএমইএর ভবিষ্যত্ পথচলার নানা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। বিজিএমইএর নেতৃত্বে আসাটাকে নিজের দায়িত্ব মনে করেন তিনি। এই দায়িত্ব পালন করতে গেলে নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়ও তিনি প্রস্তুত। রুবানা হক বলেন, সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। আমি সেতুবন্ধনের ভূমিকা রাখতে পারলে এই খাত অনেক এগিয়ে যাবে। যারা পরিচালক নির্বাচিত হয়েছে তারাও বেশ আন্তরিক এবং এটি বলব ‘গুড মিক্স’ হয়েছে। ফলে অনেক চ্যালেঞ্জই চ্যালেঞ্জ মনে হবে না। টার্গেট ঠিক থাকলে আর সদিচ্ছা নিয়ে এগুলে কোথাও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
এসময় তিনি প্রয়াত স্বামী আনিসুল হককে স্মরণ করে বলেন, ঢাকা উত্তর সিটিতে আনিস যে পরিবর্তন এনেছে সেটি পেরেছে তার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার জন্য। কাজেই দুই বছর অনেক সময়। এই সময়ে বিজিএমইএ তথা গার্মেন্টস শিল্পের জন্য অনেক কিছুই করা সম্ভব।
প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলছিলেন রুবানা হক। তারমতে, শুধু কথার কথা নয়। কাজ করতে হবে। তা হতে হবে গার্মেন্ট শিল্পের জন্য, এশিল্পে কর্মরত মালিক শ্রমিক উভয়ের জন্য এবং সর্বোপরি দেশের জন্য। আমাদেরকে নিজেদের মধ্যে দাম নিয়ে দরকষাকষি না করে বরং কিভাবে প্রতিযোগিতাসক্ষম হওয়া যায় সে বিষয়ে ভাবতে হবে। সবার জায়গা থেকে সবাই যেন সম্মান পায় সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে।
পোশাক শিল্প শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে প্রায়শ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিক্ষোভ, ভাঙচুর এমনকি বিজিএমইএ ঘেরাওয়ের কর্মসূচিও থাকে। এধরনের পরিস্থিতির যাতে উদ্ভব না হয় সেবিষয়ে বেশ সচেতন থাকার গুরুত্ব তুলে ধরে রুবানা হক বলেন, মজুরি হবে দক্ষতা অনুযায়ী। দক্ষতাকে গুরুত্ব দিলে উত্পাদনশীলতা বাড়বে। তাতে মালিক-শ্রমিক উভয়ই লাভবান হবে। এতদিন আমরা ‘এডহক’ ভিত্তিতে সবকিছুর বিবেচনা করেছি। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে মজুরি নির্ধারণ করেছি। তিনি প্রশ্ন রাখেন- পরিস্থিতি কেন মজুরি নির্ধারণের নিয়ামক হবে?
তিনি বলেন, প্রতিবছরই আমরা ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি করছি। কেউ বেশিও দিচ্ছে। কাজেই দক্ষতাই হতে হবে মজুরি নির্ধারণের নিয়ামক। তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। বিষয়গুলো নিয়ে শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একত্রে কাজ করার ইচ্ছে ব্যক্ত করে তিনি বলেন, উত্পাদনশীলতা বাড়ালে এর ইতিবাচক প্রভাব ব্যবসায় যেমন পড়বে, তেমনি বেতনভাতায় পড়বে।
দেশের প্রধান রফতানি আয়ের খাত গার্মেন্টস শিল্পে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়ের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। গত অর্থবছরে প্রকৃত রফতানি আয় হয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। বাকি সময়ে আয়ের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পেরেছি? আমাদের পর্যাপ্ত অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করতে পেরেছি? কাজেই ৫০ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হবে না। তবে ২০২১ সালের মধ্যে ৪০ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে। আসলে আমরা লক্ষ্য নিয়েছি; কিন্তু লক্ষ্য বাস্তবায়নে আনুষঙ্গিক কাজগুলো ঠিক ভাবে করিনি।
তিনি বলেন, সার্বিকভাবে রফতানি আয় বাড়াতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামো সুবিধা পাচ্ছি না। আমাদের সমুদ্র বন্দর, বিমান বন্দরের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। এসবে অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে।
পণ্য রফতানিতে লীড টাইম এখনো বড়ো চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোতে ৮ ঘণ্টায় যা সম্ভব হচ্ছে সেখানে আমাদের সময় লাগছে ৭ থেকে ১০ দিন। সক্ষমতা না বাড়ালে আমরা পিছিয়ে পড়ব। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের অনেক কিছুই এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকা থাকে। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত এবং পেপারলেস প্রশাসনিক ব্যবস্থার উপরও গুরুত্বারোপ করেন। রফতানি বাড়াতে তিনি ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ জোরদারের কথা বলেন।
অপেক্ষাকৃত ছোট কারখানাগুলো বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ বা বন্ধের পথে। অনেক মালিক কারখানা শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমরা ‘এক্সিট পলিসি’র কথা ভাবছি। এজন্য সরকারকে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন হবে থোক বরাদ্দের। বাজেট আসছে। সামনের বাজেটেই আমরা এই দাবি করতে পারি। বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও আমরা আলোচনা করব। তিনি বলেন, ছোট কারখানাগুলোকে আমি বলব বিচ্ছিন্ন না থেকে যৌথভাবে আসুন, তাতে সক্ষমতা বাড়বে। একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে দর না কমিয়ে বরং দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর চিন্তা করুন। আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ‘সস্তা নয়, প্রতিযোগিতাসক্ষম’ হতে হবে।
অ্যাকর্ডের বিষয়েও খোলামেলা কথা বলেন তিনি। বললেন, আমি চাই অ্যাকর্ড চলে যাক। তবে তাদের যাওয়াটা হতে হবে সম্মানজক। আমাদের জন্য অ্যাকর্ডের অবদান অনেক। আবার ওদেরও উচিত সারাবিশ্বে বাংলাদেশের এই মডেলটাকে ছড়িয়ে দেওয়া।
বিজিএমইএকে অ্যাকর্ডের পর্যবেক্ষক হিসাবে রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রুবানা হক বলেন, পর্যবেক্ষক হয়ে তো কোনো লাভ নেই। বরং অ্যাকর্ডে বিজিএমইএর প্রতিনিধিত্ব থাকা দরকার ছিল।
