‘নেকাব, বোরকা, হাতমোজা পরা যে চারজন আমার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন তারা সবাই ছিলেন নারী। তাদের কণ্ঠ শুনে আমি নিশ্চিত তারা নারীই ছিলেন। তাদের কাউকে আমি চিনতে পারিনি, তবে তাদের একজন আরেকজনকে শম্পা বলে ডেকেছেন। অন্যদের নাম আমি জানি না। চিনতেও পারিনি।’ ফেনীর সোনাগাজীর অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফী দুই জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে একজন চিকিত্সকের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি এ কথা বলেছেন। রাফীকে দ্রুত সিঙ্গাপুরে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এন্ড হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ও রাফীর চিকিত্সায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা তাকে লাইফ সাপোর্টে রেখেছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পর আমরা আজই (গতকাল সোমবার) সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিত্সকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে চিকিত্সকরা অনুমতি দিলে কালই (আজ মঙ্গলবার) এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’
জবানবন্দিতে যা বলেছেন রাফী : দুই জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে একজন চিকিত্সকের কাছে রাফী বলেছেন, যে চারজন তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তাদের একজনের নাম শম্পা। কয়েক বছর ধরে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি করে আসছিলেন। তিনি পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র দেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন। তার কথায় রা?জি না হ?লে তিনি হেনস্থা করতেন। আগে এ বিষয়ে পরিবারকে না জানালেও গত ২৭ মার্চ তার সঙ্গে অধ্যক্ষ অশোভন আচরণ করেন। বিষয়টি তিনি পরিবারকে জানান। পাশাপাশি মাদ্রাসার অন্য শিক্ষার্থীদেরও জানান। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর থেকে তিনি ভাইয়ের সঙ্গে মাদ্রাসায় যাচ্ছিলেন। ঘটনার দিন তার ভাইকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
রাফী বলেন, কেন্দ্রে ঢোকার পর একটা সময় তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি নেকাব, বোরকা, হাতমোজা পরিহিত চারজনকে দেখতে পান। তাদের মধ্যে কথা বলছিলেন একজন। তিনি মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বলেন এবং অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ অসত্য বলতে চাপ দেন। তিনি অস্বীকৃতি জানালে ওই চারজন ওড়না দিয়ে তার হাত বেঁধে ফেলেন। তার গায়ে ওরা কিছু একটা ছুড়ে দেন। তারপর বলেন, ‘যা এবার পালা’। গায়ে আগুন লাগা অবস্থাতেই তিনি দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
সিঙ্গাপুর পাঠানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : দগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রীকে উন্নত চিকিত্সার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া ওই শিক্ষার্থীকে দেখতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যান। তাকে লাইফ সাপোর্টে দেখার পর বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেনকে সঙ্গে নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে তিনি কথা বলেন।
নিরাপত্তাহীনতার কথা আগেই প্রশাসনকে জানিয়েছিল পরিবার : অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর থেকে দুর্বৃত্তদের অব্যাহত হুমকিতে নিরাপত্তাহীন ছিল রাফীর পরিবার। এমন অভিযোগ করে তার ভাই মাহমুদুল হাসান বলেছেন, মামলা করার পর নিরাপত্তাহীনতার কথা স্থানীয় পুলিশ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পৌর মেয়র ও জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েছিলেন তারা। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ বলছে, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়ে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সোনাগাজী পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা দায়েরের পর থেকে ওই ছাত্রীকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টার আগে পরিবারটি তাদের উত্কণ্ঠার কথা আমাকে জানিয়েছিল। এ নিয়ে থানার ওসি ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছি। কিন্তু তারপরও তাকে আমরা নিরাপত্তা দিতে কেন ব্যর্থ হলাম তা বুঝতে পারছি না।’
তবে সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ঘটনার পর কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পুলিশকে অভিযুক্ত করে এমন অভিযোগ করতে পারেন। ভিকটিমকে উদ্ধার করতে পুলিশ কনস্টেবল রাসেল আহত হন। পুলিশই প্রথম ভিকটিমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ জন আটক : এ ঘটনায় রাফীর ভাই মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় অজ্ঞাত ৪ জন বোরকা পরিহিত ছাত্রীসহ নাম না জানা আরো অজ্ঞাত ছাত্রীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় পুলিশ গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৭ জনকে আটক করেছে।
সোনাগাজীর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সার্কেল সাইকুল আহমেদ ভূঁইয়া জানান, জিজ্ঞাবাদের জন্য মাদ্রাসার দারোয়ান মোস্তফা, নৈশপ্রহরী নুর ইসলাম, মাদ্রাসার ছাত্র আলাউদ্দিন, ছাইদুল, জসিমকে আটক করেছে।
এলাকাবাসী জানান, কিছুদিন আগে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তার অনুগত ছাত্র নুর উদ্দিনের নেতৃত্বে ৫ জনকে কক্সবাজারে আনন্দ ভ্রমণে পাঠান। তারা ফিরে আসার পরই এ ঘটনা ঘটল।
