পৃথিবীতে কত কিছুরই আজব নাম থাকে। তবে কোনো রাস্তার নাম যদি শুনি এলিয়েন রোড; একটু খটকা তো লাগবেই। নামটা বেশ আজব হলেও কিন্তু গুজব নয়। উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) প্রধান ফটক দিয়ে ব্যায়ামাগার হয়ে এম এ ওয়াজেদ ভবন যাওয়ার পথে যে বাইপাস রাস্তাটা আছে সেটাই এলিয়েন রোড।
রাস্তার অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন বলে ভাবার অবকাশ নাই, এই রাস্তায় কোনোদিন এলিয়েন হেঁটেছিল তবে, যে দো-পায়ো দৈত্যরা মূল রাস্তা ব্যতিরেকে ফুল, সবুজ ঘাস, ফুলের গাছ পৃষ্ঠতলে পিষে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য নষ্ট করে এ রাস্তাটা ব্যবহার করে তাদেরকেই মূলত ব্যঙ্গ করে এলিয়েন ডাকা হয়।
এ তো গেল কেবল একটা রাস্তাকে ঘিরে সংক্ষেপে বিস্তারিত গল্প। এরকম ভূরি ভূরি গল্প আর আজব সব নাম গাদাগাদি হয়ে মিশে আছে হাবিপ্রবির প্রতিটি চত্বরে, রাস্তায়, প্রতিটি ধূলিকণায়। একেকটা আজব নামের পিছনের গল্পগুলোও বেশ আজব।
হাবিপ্রবিতে যেমন আছে বৌদি চত্বর (কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে), টাইটানিক রোড (এম এ ওয়াজেদ ভবন-এর পিছনে এবং প্রশাসনিক ভবনের সামনের রোড), চিড়িয়াখানা (টার্কি ফার্ম), ফাঁকিবাজ চত্বরের (টিএসসি-এর সামনে) মতো কিছু ব্যঙ্গার্থক, হাস্য রসাত্মক নাম ও নামের পিছনের গল্প। তেমনই আছে মীর সড়ক, রিমা চত্বর-এর মতো লোমহর্ষক, পীড়াদায়ক ইতিহাস বিবর্জিত কিছু স্মৃতি। ২০১৬ সালের ৪ মার্চ ফুড প্রসেস এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী রহিমা রহমান রিমা চেহেলগাজী মাজারের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালে তার স্মরণে জিমনেসিয়ামের পিছনের ফাঁকা জায়গার নামকরণ করা হয় রিমা চত্বর।
আর ২০১৬ সালের ১৬ জুন এগ্রিকালচার অনুষদের ১৫তম ব্যাচের ছাত্র মনিরুজ্জামান মীর রিমা চত্বর থেকে দশ-বারো গজ দূরে ক্যাম্পাসের বাসের চাপায় তাত্ক্ষণিক মৃত্যুবরণ করলে, তার স্মরণে রোডের নাম “মীর লেন বা মীর সড়ক” রাখার প্রস্তাব উঠে। পরে সেটা গৃহীত হয়নি তবে যারা মীর এর খুব কাছের তারা এখনো এই রোডকে মীর সড়ক নামেই সম্বোধন করে।
আবার, কোনো দেয়ালের নাম যদি হয় হতাশার দেয়াল সেটাও কি কোনো ভাবে কম আজব শোনাবে?
ক্যাম্পাসের রূপালী ব্যাংকের রিমা চত্বরের দিকের দেয়ালটাতে প্রতি সেমিস্টার শেষে শিক্ষার্থীদের আমলনামা ডিসপ্লে করা হয়, নির্ণয় হয় তাদের অবস্থান। এই সময় যাদের অবস্থান হয় নিচে তারা হয়ে পড়ে হতাশাগ্রস্ত, বন্ধুবান্ধবদের অগ্রাহ্যের পাত্র। তাদের ধারণা ভার্সিটি জীবনের হতাশার সৃষ্টি এই দেয়াল থেকে, আর এ জন্যই এর নাম হতাশার দেয়াল।
আরো, আছে ঝোপঝাড় ও বরই গাছে মোড়ানো ১৫-২০ ফুট উঁচু একটা ধ্বংসাবশেষ মাটির ঢিবি যা ময়নাদ্বীপ নামে পরিচিত। যদিও এখন মাটির ঢিবি মনে হয়; কিন্তু এটা এক সময় পাহাড়ই ছিল। পাহাড়টাকে কেটে চা বাগান করার সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবায়ন হয়নি, শুধু পরিবর্তন হয়েছে নামটা।
আমাদের প্রত্যেকের জানা, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে স্বাধিকার আন্দোলন ও ন্যায্যদাবি আদায়ের সর্বোত্তম উত্কৃষ্ট দৃষ্টান্ত। আর, হাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের সব ন্যায্যদাবি আদায়ের আন্দোলনসমূহ শুরু হয় ডি বক্স (১ম গেট থেকে ২০ গজ ভিতরে) থেকে, যার শেষ হয় সাফল্যে।
এছাড়াও অন্যান্য চত্বর হচ্ছে- লাইব্রেরি চত্বর, শহীদ মিনার চত্বর, লিচু বাগান (একাডেমিক-৩ এর সামনে), ফিশারিজ পুকুরপাড় (হাবিপ্রবি স্কুলের সামনে) টিএসসি চত্বর, ফোয়ারা চত্বর, থ্রি ডি বক্স (টিএসসির সামনে), ও বক্স (এম এ ওয়াজেদ ভবনের সামনে), আই বক্স। এই চত্বরগুলোতে জম্পেশ আড্ডা বসে সকাল-বিকাল, বয়ে যায় প্রাণের স্পন্দন। চলে বিরামহীন গল্প, গিটার আর সেল্ফির কারসাজি। আর, এভাবেই চত্বরে চত্বরে গল্প, গান ও আড্ডার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েরা নিজেদের ভবিষ্যত্ গড়ে। এই তরুণ প্রজন্মের হয়ে ওঠে জাতির স্বপ্ন। তারপর, একদিন এরাই জাতির হাল ধরে, দেশকে নিয়ে যায় বহু হতে বহুদূর।
স্থান: ফোয়ারা চত্বর, হাবিপ্রবি
ফটোগ্রাফার: নোমান
