কয়লা কুড়িয়ে বেঁচে থাকা !

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৭, ১৬:০১
 
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা একটি জনপদের নাম সুনামগঞ্জের তাহিরপুর। এ জনপদের হাজার হাজার মানুষের প্রধান জীবিকা হলো কয়লা কুড়ানো। তারা যাদুকাটা নদীর স্রোত থেকে বালির সাথে মিশে থাকা কয়লা কুড়িয়ে এবং তা বিক্রি করে বেঁচে আছেন।
 
প্রতিবছর বছর বর্ষায় ভারত থেকে প্রবাহিত স্রোতধারায় বালির সাথে মিশে থাকা কয়লা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। ভারতীয় পাহাড় ধ্বসে নুড়ি বালির সাথে মিশে থাকা কয়লা নদীর স্বচ্ছ পানিতে দেখা যায়। এসব কয়লা ঠেলা জালিতে তুলে ও পানিতে ছেঁকে বালি থেকে আলাদা করে বস্তায় ভরে রাখা হয়। বস্তা প্রতি সাড়ে ৩শ'/৪শ' টাকা দরে বিক্রি করে থাকে স্থানীয় কয়লা মহাজনদের কাছে।
 
যুগযুগ ধরে পাহাড়ের বুক চিরে প্রবাহিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুখর যাদুকাটা নদীর উৎস মুখ হতে ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত এ নদীতে প্রতিদিন এভাবে কাজ করে থাকে লক্ষাধিক শ্রমিক। যারা পাথর, বালি আর কয়লা তুলে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।
 
২৮ বিজিবি সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়ন নিয়ন্ত্রিত লাউড়েরগড় বিওপি ক্যাম্প ও গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত এ নদীতে তাহিরপুর সহ পার্শ্ববর্তী জামালগঞ্জ ও বিস্বম্ভরপুর উপজেলার কমপক্ষে ১০ হাজার শ্রমিক প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যাবধি শুধু কয়লা কুড়ানোর কাজে নিয়োজিত। এদের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। নদীর তীরবর্তী লাউড়েরগড়, ডালারপাড়, ছড়ারপাড়, পুরানলাউড়, মোকশেদপুর, মানিগাও, মাহারাম বড়গোপ, রাজারগা, জামবাক, কড়ইগড়া, চানপুর, রজনীলাইন, রাজাই, স্বরুপগঞ্জ, মাছিমপুর, চিনাকান্দি ও ছাতারকোনা গ্রামের নারীরাই এ কাজে বেশি নিয়োজিত।
 
IMG0
 
যে সকল হতদরিদ্র শ্রমজীবী নারীরা কাজের অভাবে দিনের বেলা আহার জুঠাতে পারতো না আজ তাদের অনেকেই স্বাবলম্বী। প্রতিদিন ৫শ' থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতে পারেন তারা। আবার কাজের দক্ষতা অনুযায়ী কয়লা মহাজনরা অগ্রিম টাকাও দিয়ে থাকেন ওইসব নারী শ্রমিকদের।
 
মানিগাও গ্রামের জরিনা, লাউড়েরগড় এর কুলসুমা, রাবেয়া, মাহারাম এর সোনাবান, রাজাই গ্রামের তরী হাজং এর মত অনেক শ্রমজীবী নারীরা  কয়লা কুড়িয়ে সংসারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। অনেক শ্রমজীবী পরিবারের ছেলে-মেয়েরা এখন স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করছে। সন্তানদের লেখাপড়ার পড়ার খরচ যোগাতে এখন আর কোন বেগ পেতে হয় না। বিস্বম্ভরপুর উপজেলার স্বরুপগঞ্জ গ্রামের কয়লা শ্রমিক জান্নাত আরা বলেন, 'আমি ও আমার ২ ছেলে মিলে ৬ মাস কয়লা তুলে বিক্রি করে ৩ লাখ টাকা রোজগার করেছি। সেই টাকায় দুই ছেলের বিয়ে, টিনের ঘর নির্মাণসহ গরু ছাগল কিনে সুখে আছি।' জান্নাত আরার মত সীমান্তবর্তৗ হাজার হাজার শ্রমজীবী পরিবার প্রকৃতির করুণায় বদলে দিয়েছে তাদের জীবনদান।সুখেও স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাচ্ছে তাদের পরিবার পরিজন সহ।
 
স্থানীয় বাদাঘাট ইউপি'র সাবেক চেয়ারম্যানও যাদুকাটা বালুপাথর সমিতির সভাপতি নিজাম উদ্দিন বলেন, 'বালির সাথে মিশে থাকা কয়লা তুলে হাজার শ্রমিক বেঁচে আছে এটা আল্লাহ পাকের অলৌকিক দান। আমি সব সময় শ্রমিকদের পাশে ছিলাম এখনো আছি।' তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, 'এ জনপদের শ্রমিকরাই আমার চালিকাশক্তি। তাদের বিপদাপদে সর্ব সময়ই আমি পাশে রয়েছি ও কাজ করে যাচ্ছি।'
 
ইত্তেফাক/জামান