কথায় আছে, পাগলে কি না বলে আর ছাগলে কি না খায়। ছাগলের রসনা এমনই যে, এই প্রাণীটির মধ্যে যাহা ইচ্ছা তাহাই ভক্ষণ করিবার অভ্যাস গড়িয়া উঠিয়াছে; কিন্তু মানুষও যদি ছাগলের মতো যাহা ইচ্ছে তাহাই তথা ‘যাচ্ছেতাই’ ভক্ষণ করিতে শুরু করে, তবে ভয়াবহ বিপদের সমন মানুষের শিহরের নিকট ঠাঁয় দাঁড়াইয়া থাকিবে নিশ্চিত। বিশ্বখ্যাত চিকিত্সা সাময়িকী ল্যানচেট সম্প্রতি জানাইয়াছে যে, কুখাদ্য খাইয়া মানুষ মৃত্যু ডাকিয়া আনিতেছে। দেখা গিয়াছে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী কুখাদ্য গ্রহণ।
কোনো প্রক্রিয়াজাত খাদ্য যদি মেয়াদোত্তীর্ণ হইয়া যায় তবে তাহাও অখাদ্য হইয়া পড়ে। এইসকল অখাদ্য বা কুখাদ্যের নেপথ্যে কাজ করিতেছে বাংলাদেশের কিছু অসত্ ব্যবসায়ীর সীমাহীন লোভ। আর ইহার বলি হইতেছেন কোটি কোটি মানুষ। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হইয়াছে মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যের ভয়াবহ চিত্র। জানা গিয়াছে, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দেশে আমদানি করিতেছে হিমায়িত মহিষ, ভেড়া ও দুম্বার মাংস—যাহার একটি বড় অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ। অন্যদিকে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করিয়াই আমদানি করা দুম্বা-ভেড়ার মাংস দেশে ঢুকিয়াই হইয়া যাইতেছে খাসি, মহিষ অথবা গরুর মাংস। ভয়ঙ্কর কথা হইল, এই সকল মেয়াদোত্তীর্ণ এবং নাম পরিবর্তিত মাংস ঢাকার বিভিন্ন পাঁচতারকা হোটেল, সুপারশপ হইতে শুরু করিয়া দেশের চার শতাধিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় হইতেছে। এমনকী আমদানি করা মাংসগুলি জীবাণুমুক্ত কি না, তাহাও যাচাই করা হইতেছে না। কিছুদিন আগে একটি অভিযানে রাজধানীর তেজগাঁও-নাবিস্কো এলাকার একটি হিমাগার হইতে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ দুম্বা ও মহিষের মাংস, খেজুর, কিশমিশ, আচার, চিপস, মাখন এবং টুনা, রূপচাঁদা ও চিংড়ি মাছ জব্দ করা হয়। ওই সকল খাদ্য ছিল ইথিওপিয়া, সৌদি আরব, দুবাই, তিউনিসিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ হইতে আমদানিকৃত, যাহাদের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হইয়া গিয়াছে। এমনকী ২০০৬ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুরও ওইসকল হিমাগারে পাওয়া গিয়াছে, যাহা আসন্ন রমজান মাসে বাজারজাত করিবার পরিকল্পনা ছিল।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, মেয়াদোত্তীর্ণ ও জীবাণুযুক্ত মাংস একঅর্থে অখাদ্যের নামান্তর। উহারা স্লো পয়জনের মতো। হাইকোর্টও খাদ্যে ভেজালকে দুর্নীতি বলিয়া আখ্যা দিয়াছে। অন্যদিকে ল্যানসেটের গবেষকরা বলিতেছেন যে, নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাসের জন্য মানুষের হূদযন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হইতেছে, বৃদ্ধি পাইতেছে ক্যান্সারের মতো রোগ। দুঃখের ব্যাপার হইল, নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এখনো খুব বেশি সচেতন হইয়া ওঠে নাই। নিরাপদ খাবার নিশ্চিতকরণের বিধিবিধান পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করা হয় না বলিয়াই এই বিপত্তি হইতেছে বলিয়া মনে করেন অনেক পুষ্টিবিদ। যেই কারণে বাজারে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো খাদ্যই অবিক্রীত থাকে না। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে অসচেতনতার কারণে সকল অখাদ্য-কুখাদ্যই শেষাবধি বিক্রয় হইয়া যায়। এই ব্যাপারে খাদ্য নিরাপত্তা আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যাপারেও জোর দিতে হইবে।
