বাংলায় কার পাল্লা ভারী মোদির না মমতার?

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ২২:০২

আরশিনগর g বাহার উদ্দিন

মৃদু বাতাস বইছে। লেখার টেবিল থেকে কাচ দেওয়া জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে হাওয়ারা বড্ড ম্রিয়মাণ। গাছের পাতা নড়ছে, নিঃশব্দে। রবিবার একবার সকালে, রাতে আবার ৯টা-১২টা পর্যন্ত কলকাতার উত্তর-পশ্চিম আর দক্ষিণ-পূর্বের নানা প্রান্তে ভোটের মেজাজ খুঁজতে গিয়ে লক্ষ করেছি, আবহাওয়ার বদল নেই। চরাচরে সাধারণ মানুষের হাবভাবেও অদ্ভুত নিরাসক্তি। প্রচারের ঢাকঢোল নেই। দেয়ালে দেয়ালে কেবল তৃণমূল, কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃঢ় ভাষার অক্ষরিত ঝঙ্কার। হঠাত্ হঠাত্ মনে হয়েছে, বিজেপি, কংগ্রেস ও সিপিএম প্রাচীর-প্রচারে নেই কেন?

প্রথম দফায় নির্বাচন শুরু হবার আর মাত্র একদিন বাকি। ১১ এপ্রিল ভোট হবে অন্ধ্রপ্রদেশের ২৫, অরুণাচলের ২, আসামের ৫, বিহারের ৪, জম্মুকাশ্মীরের ২, মহারাষ্ট্রের ৭, মনিপুরের ১, মেঘালয়ের ২, ত্রিপুরা-মিজোরাম, নাগাল্যান্ড-মনিপুর ও সিকিমের ৩, তেলেঙ্গনার ১৭, উত্তর প্রদেশের ৪, উত্তরাখন্ডের ৪, আন্দামান-লাক্ষাদ্বীপের ২ এবং পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনের ২ হিস্সা আলিপুরদুয়ার আর কোচবিহারে। বিজেপি উত্তরবঙ্গের সব আসন দখল করতে মরিয়া। কিন্তু তাদের প্রার্থীদের  নামডাক নেই। অচেনা। কেউ কেউ আবার একেবারে নবীন। তবে সীমান্তে মোদির দলের কিছুটা ভিত তৈরি হয়েছে। হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। ভোটে এসবের কতটা প্রতিচ্ছায়া ভেসে উঠবে, বলা কঠিন। প্রবল হারে ভোট যদি পড়ে, বুঝতে হবে যুদ্ধংদেহী তৃণমূল আর বিজেপির সমর্থকেরা সমানভাবে মাঠে আছেন, ঘাটেও আছেন। তৃণমূল সংগঠিত শক্তি। তাদের একনম্বর প্রতিদ্বন্দ্বীর সংগঠন ভারী দুর্বল। অভ্যন্তরীণ লড়াইও কম নয়।

কেবল আবেগ দিয়ে ভোটে জেতা অসম্ভব। নরেন্দ্র মোদি রবিবারও কোচবিহারে সভা করে গেছেন, প্রধানমন্ত্রী বলে কথা, সভার ভিড় অস্বীকার করা অন্যায়। ভিড়ের প্রতিফল কী দাঁড়াবে, হিসেব-নিকেশ অস্পষ্ট। সম্ভবত এজন্যই প্রধানমন্ত্রী জনপ্রিয় নেত্রীকেই কেবল টার্গেট করেছেন। বলেছেন, ‘পিসি-ভাইপো উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ আজ অনুপ্রবেশের অবাধ আশ্রয়।’ গেরুয়া শিবিরের দৃষ্টিতে অনুপ্রবেশ মানেই বাংলাদেশের বিশেষ এক জনসম্প্রদায়ের লোকদের বেআইনি ঢুকে পড়া। এখানে  মোদি, তাঁর দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহও ভাষণে, হুঙ্কারে সরাসরি সমাজের না-পছন্দের মেরুকরণ দাবি করছেন। বাংলায়ও এনআরসি-র প্রতিশ্রুতি ঢেলে দিচ্ছেন।

২০১৪  সালের  লোকসভা ভোটের প্রচারে এসে প্রথমে হুগলিতে, পরে আসানসোলে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ৪৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন, তাঁদের এবার ঘটিবাটি নিয়ে ফিরে যেতে হবে। তাঁর ওই বয়ানে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ভোটের বাক্সে। এবার নাগরিক পঞ্জির নামে ভোট ধরার ভাষণ-শাসন শুরু হয়েছে, এর বিরুদ্ধে প্রবল ফিসফাস উড়ছে। গর্জে উঠেছে মমতার আক্রোশ। কংগ্রেস আর বামপন্থিরাও মোদি-অমিতের কৌশলী আওয়াজে অসন্তুষ্ট। ক্রুদ্ধ।  তাঁদের অভিযোগ, বিজেপি বিভাজন তৈরি করে এক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরেক সম্প্রদায়ের, এক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ভিন্ন জনগোষ্ঠীর দূরত্ব বাড়াতে চাইছে যা বাংলার ঐতিহ্যে নেই। মমতা আসামের ধুবড়ি, পরে কোচবিহারের ফালাকাটার সভা থেকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে কঠোর ভাষায় বলেছেন, এনআরসি করবেন। অনুপ্রবেশের গুজব ছড়াচ্ছেন। এনআরসি আসামে যে কী ভয়ংকর সমস্যা সৃষ্টি করেছে, তা দেখেননি? জাতিবিরোধী হিংসায় মানুষ খুন হয়েছেন, আত্মহত্যা করেছেন, ডিটেনশন ক্যাম্পে বহু মানুষ এখনও বন্দি। বাংলায় ওই পরিস্থিতি তৈরি হতে দেব না। কখনো না। ভোটেই জবাব মিলবে। বিজেপি একটি আসনও পাবে না।  ৪২-এর ৪২-ই আমাদের আয়ত্তে  থাকবে।

বাংলার মসনদ দখলে মরিয়া গেরুয়া শিবির গলা চড়িয়ে বলছে, অন্তত ২৩ আসন তাঁদের দল দখল করবে। সেটা কোথায়, কোন কোন এলাকায়— এ প্রশ্নের জবাব পুরোপুরি অনুচ্চারিত। স্টার আনন্দ সম্প্রতি দুটি সমীক্ষা করে দেখিয়েছে, বিজেপির আসন বাড়বে। বঙ্গের দুই প্রান্তে, উত্তরে ও দক্ষিণে। প্রথম জরিপে ওরা বললেন, আলিপুরদুয়ার থেকে বনগাঁ পর্যন্ত ৮ আসনে বিজেপি প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা বিস্তর। বামপন্থিরা একটি আসনও পাবে না। কংগ্রেস পাবে তিনটি। সবই দক্ষিণবঙ্গে। তৃণমূল কয়েকটি আসন হারাবে, দখলে রাখবে ৩১টি। দ্বিতীয় সমীক্ষায় বিজেপির আসন একটু বেড়ে গেল। বাড়লো কংগ্রেসের। কমলো তৃণমূলের। দিনকয়েক আগে দিল্লির একটি চ্যানেল সমীক্ষা রিপোর্ট দেখিয়ে বললো, বাংলার বিজেপি অন্তত ১১ আসন দখল করবে। তৃণমূল বেশি পাবে। আসনশূন্য হয়ে থাকবে বামফ্রন্ট। মালদা-মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস কিছুটা স্বস্তিতে থাকবে। কোথাও কোথাও, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, মুখে মুখে বিজেপির কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নধ্বনি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব ধ্বনির প্রতিধ্বনি ময়দানে কোথায়?

সমীক্ষার ফল প্রায়ই মিলে না। গ্রাম-শহরের জনাকয়েক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জনরায়ের যে আগাম ইঙ্গিত দেওয়া হয়, তা শেষ পর্যন্ত চুপসে যায়। কদাচিত্ মিলে গেলে বিস্ময় এগিয়ে আসে, ঝড়ে বক মরলো, ফকিরের কেরামতি বাড়লো। সমীক্ষা আদতেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। কখনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কখনো বিজ্ঞাপনের গরুকে আমরা গাছে উঠতে দেখি। পরে দৃষ্টিভ্রম দূর হলে বুঝতে পারি, চতুষ্পদ প্রাণীটি মাটিতে ছিল, মাটিতেই আছে। পশ্চিমবঙ্গে, এবারের লোকসভা ভোটেও কি বিজ্ঞাপিত গরুকে আখেরে পরমানন্দে ঘাস খেতেই দেখব?

গত বিধানসভা, পুরসভা কিংবা পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপি হালে পানি পায়নি। হ্যাঁ, তাঁদের ভোট বেড়েছে, প্রায় শূন্য থেকে বিধানসভা ভোটে গণ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু আসন পেয়েছে কুল্লে একটি। খড়গপুরে বাম-কংগ্রেসের জোটকে হারিয়ে। এবারের লোকসভা ভোটের আগে বামপন্থিরা, কংগ্রেসও আঁতাত করতে চেয়েছিলেন। জোট চেষ্টা মাঝপথে ভেস্তে যায়। দুই দলই আলাদাভাবে লড়ছে। জোট হলে, ভোট ভাঙত। ফায়দা হতো বিজেপির।

সর্বভারতীয় স্তরে কংগ্রেসের প্রধান শত্রু বিজেপি। সিপিএম, তৃণমূলেরও তাই। অতএব, যেসব লোকসভা আসনে কংগ্রেসের জেতার সম্ভাবনা প্রায় নেই, সেখানে কংগ্রেস সমর্থকেরা সম্ভবত তৃণমূল প্রার্থীদের দিকেই ঝুঁকে থাকবেন। আমল দেবেন না বিজেপি কিংবা বামপ্রার্থীকে। বামেরা কী করবেন? মমতা তাঁদের ক্ষমতাচ্যুত করেছেন। সে কারণে প্রতিশোধ স্পৃহা থাকবে। তৃণমূলের আসন কমাতে লড়ে যাবেন তাঁরা।

অভিযোগের ফিসফাস আমাদের কানে আসে, নানা স্তরের ভোটে হতাশ বামপন্থিদের একাংশ কোথাও কোথাও বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, এজন্যই  বিজেপির ভোটের হার বেড়েছে। এ অভিযোগ কতটা সত্য তা বামেরাই বলতে পারবেন। আন্দাজ আর রটনা সত্যকে নয়, অবিশ্বাস আর সংশয়কেই বড়ো করে। আমাদের দৃষ্টিপাত সন্দেহ আর সংশয় থেকে অনেকানেক দূরে। কান দিয়ে দেখি না, চোখ দিয়ে শুনি না। বাস্তব যা বলছে অঙ্কের হিসাব যে ছবি প্রতিচ্ছবির আভাস দিচ্ছে, রাহ-এ হক— সত্যের পথ যে নির্দেশ জারি করেছে, তাকেই গুরুত্ব দেব, দিতে হয়। অনুমান কখনো নির্ভুল নয়। ব্যক্তি ইচ্ছাকে সে প্রশ্রয় দেয়। ভুল রাস্তা দেখায়, বাড়িয়ে তোলে বিভ্রান্তি।

উদ্বেগ কোথায়? বাংলার সম্প্রীতির স্থিতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে! অতএব গো বলয়ের ভেদাভেদ আশ্রিত, জাতপাতের রাজনীতিকে রুখতেই হবে। এই প্রতিজ্ঞা কেবল মমতার নয়, বাংলার সব শ্রেণির, সব ধর্মের, সব ভাষাভাষি জনতার। ২০১৪ সালে মোদির ঝড়ো হাওয়াও বাংলাকে টলাতে পারেনি। ওই নির্বাচনে  তৃণমূলের ভোটের হার ছিল ৪০.৭০, সিপিএমের ২৪, কংগ্রেসের ১২ শতাংশ আর বিজেপির সর্বনিম্নে, ১০.২। তৃণমূল ৩৪ আসনে জিতেছিল। সিপিএম ২, কংগ্রেস ৪।

এবার সারা ভারতেই মোদি হাওয়া ম্লান। কয়েক মাস আগে পাঁচ রাজ্যের বিধান সভা ভোটে অমিত মোদির বিজেপি হেরে গেছে। তেলেঙ্গানায় কেআরসি, মিজোরামে এমএনএফ, রাজস্তান, ছত্তিসগড়, মধ্যপ্রদেশে জয়ী হলো কংগ্রেস। এই ঝোঁক বিলীন হয়নি। মমতার নেতৃত্বে জড়ো হয়েছে ফেডারেল জোট। কংগ্রেস তলে তলে তাঁদের সঙ্গে আছে। খোদ দিল্লিতেই আপ-কংগ্রেসের ঐক্য গড়ে উঠেছে। উত্তরপ্রদেশে অতীতের তিক্ততাকে অতিক্রম করে জোট বেঁধেছে মোলায়েম সিং-এর সমাজবাদী আর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি। বিহারেও লালুপ্রসাদের দলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে কংগ্রেস। রাহুলের আক্রমণাত্মক উত্থান, সক্রিয় রাজনীতিতে শ্রীমতী ইন্দিরার নাতনি প্রিয়াঙ্কার প্রবেশে ঝিমিয়ে পড়া কংগ্রেসে এখন সাজ সাজ রব।

বাংলায়ও মমতার জেদ আর তেজ পাহাড় থেকে সমতলে ঝলসে উঠছে প্রতি মুহূর্তে। ঝড়ের পূর্বাভাস সর্বত্র। যেমন সর্বাত্মক প্রচারে, তেমনি দেওয়াল-লিপিতে। এরকম চতুর্মুখী লড়াইয়ে অমিত শাহ আর তাঁর বঙ্গীয় অনুগামীদের বাংলা দখলের স্বপ্ন ‘ঝরো ঝরো বাদল দিনে’ ভাসবে না হাসবে? না অগ্নিবর্ষী মমতার দুঃসাহস প্রবলবেগে দিল্লিমুখী হয়ে উঠবে? এ প্রশ্নের জবাব কী? প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, বিরোধীদের একমাত্র টার্গেট এই মোদি। উন্নয়নের ‘স্পিডব্রেকার’ দিদিরও নিশানা এই বান্দা। মোদি বলেছেন, বাংলায় আমার জনসমাবেশের উত্তাল তরঙ্গ দেখে উনি সন্ত্রস্ত, ভীত। সত্যি কি মমতা ভয় পাবার মতো মহিলা? ভয় পেলে কেউ কি একাই মঞ্চ কাঁপায়, দাপিয়ে বেড়ায়? না, নিজের জোরেই পাখা মেলে জোনাকি? এসব প্রশ্নের উত্তর দেবার এক্তিয়ার নেই আমাদের। আমরা কেবল দেখছি। নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে দেখে যাওয়াটাই ধর্ম। ভোটের পর আসন কার নড়বে? বাংলায়, মহাভারতের দিল্লিতেও কার কুর্সি উঁচু হবে, পাঁচ দফার নির্বাচনে, ঠিক করবে জনরায়। গণদেবতা নিঃশব্দে আড়াল থেকে হাসছেন, সমীক্ষার মনগড়া হিসাব দেখে মৃদু হাওয়া পেরিয়ে ক্রমশ জেগে উঠবে হয়তো-বা তাঁর ঝড়ো বাতাস, বাতাসের অট্টহাসি। অদৃশ্য নয় এই পূর্বাভাস। নয় লক্ষ যোজন দূরে!

n লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক

সম্পাদক, ‘আরম্ভ’।