অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলার সক্ষমতা কি আমাদের আছে?

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫৭

ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ

সকালে পত্রিকায় খবরটি পড়েই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। চলে গেলেন ফায়ার ফাইটার সোহেল রানা। বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগার পর তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সেদিন এক এক করে বেশ কয়েকজনকে ল্যাডারের সিঁড়ি বেয়ে আগুন থেকে মুক্ত করেন তিনি। এক সময় সিঁড়িতে আটকে পা ভেঙে যায় তার। পেটে আঘাত পান প্রচণ্ড। পরে শুনতে হলো হাসপাতালে লড়াই করে মৃত্যুর গল্প। হূদয়বিদারক এ ঘটনা।

ঠিক এর উল্টো ঘটনা দেখলাম টেলিভিশনের সংবাদে। রাজউক কর্মকর্তা বনানীতে মনিটরিং করতে গেছেন সাবেক এক সংসদ সদস্যর অ্যাপার্টমেন্ট। বহুতল ভবনের ম্যানেজার সরাসরি রাজউকের কর্মকর্তাদের অপমানের সুরে ধমক দিলেন, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন আপনারা! আমরা অতিরিক্ত দুইতলা বানায়া অপরাধ করছি, কিন্তু আপনি ক্যামনে আমগোরে এই অপরাধে প্রশ্রয় দিছেন হেইডা টিভিঅলার সামনে কন? পারমিশনের বুদ্ধিডা কারা দিছিল, কন?’

মানে, এতগুলো মানুষের সামনে উক্ত কর্মকর্তার সারাজীবনের সকল অর্জনের মৃত্যু হলো। দুটো মৃত্যু দুই ধরনের। কারো চলে যাওয়ায় কেউ হাহাকার আর্তনাদ করে, আবার কারো মৃত্যুতে মানুষ ভর্ত্সনা করে।

গত দুই মাস ধরে বেশ আতঙ্ক কাজ করছে। যদিও এ সিজনটা সচেতনতার। অগ্নিদুর্ঘটনা এই মুহূর্তে আমাদের জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক বিভীষিকাময় আতঙ্কের নাম। ইদানীং প্রায়ই আমরা খবর পাচ্ছি, এই দানবের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে অনেকের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে।

আমরা হয়তো অগ্নিদানবের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাওয়া তাজা প্রাণগুলোকে দেখে আঁতকে উঠছি, হয়তো শোকে মোহ্যমান হচ্ছি, কিন্তু এই দানবকে মোকাবিলা করতে আমাদের আসলে কতটুকু সক্ষমতা রয়েছে? কেনই-বা এই দানব বারবার আমাদের আক্রমণের সুযোগ পাচ্ছে? এখন সময় এসেছে প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজে বের করার।

প্রায় প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমরা দেখি, আমাদের কর্তাব্যক্তিরা মিডিয়ার সামনে এসে শোক প্রকাশ করে বেশ শক্ত শক্ত কথা বলেন। তারা আরো শক্তভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কিন্তু শক্ত তদন্ত কমিটির শক্ত রিপোর্টটি কোনো এক অজানা কারণে নরম হয়ে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।

আরো হাস্যকর বিষয় হলো— প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমরা জানতে পারি যে ভবনটি নিয়ম মেনে করা হয়নি। কাদম্বিনী দেবীকে যেরূপ ‘মরিয়া প্রমাণ করিতে হইয়াছিল তিনি মরেন নাই’, ঠিক তেমনি ভবনকে দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে প্রমাণ করতে হয় যে ভবনের মালিক নিয়ম মেনে ভবনটি নির্মাণ করেননি। এমন কোনো দুর্ঘটনা নেই যেখানে কর্তাব্যক্তিরা এই নিয়মের ব্যতিক্রম করেছেন। হোক সেটা পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা কিংবা নতুন ঢাকার এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ড।

চকবাজারের দুর্ঘটনার পর একটি কথা বলে মূল দায়িত্বকে এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে তা হলো—পুরান ঢাকার স্থাপনাগুলো অনেক পুরনো এবং এলাকা ঘিঞ্জি হওয়ার কারণে সেখানে চাইলেও অনেক কিছু করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ঘটনাটি যখন অভিজাত এলাকা বনানীতে ঘটলো তখন কিন্তু আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকার অবস্থা রইলো না। দুর্ঘটনার পর জানা গেল, সেই একই পুরনো কথা। তা হলো, ভবনটি রাজউকের নিয়ম মেনে করা হয়নি। ভবনটিতে জরুরি মুহূর্তে বের হওয়ার মতো কোনো পথ ছিল না। ২৪ ইঞ্চি সাইজের একটি পথ ছিল। প্রত্যেক ফ্লোরে পথটি এমনভাবে ডেকোরেশন করা ছিল যে, সেই পথ দিয়ে সহজে বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কোনো ফ্লোরে আগুন নেভানোর মতো যন্ত্র ছিল না।

দু-একটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র পাওয়া গেলেও সেগুলো ছিল অকার্যকর। আবার সেই পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে বিন্দুমাত্র ভুল করলেন না কর্তাব্যক্তিরা, সেই একই গল্প শোনালেন দেশবাসীকে। অথচ আমরা জানি, একটা ১০ তলার ওপরের বিল্ডিংয়ের প্ল্যান পাস করাতে পরিবেশ, ফায়ার ফাইটিংসহ প্রায় ১৩টি দফতরের অনুমোদন লাগে। আমরা শুধু জানলাম নিয়ম মানা হয়নি, কিন্তু সেই ১৩টি দফতরের কী ভূমিকা ছিল তা অন্ধকারেই রয়ে গেল। ১৮ তলার অনুমোদন নিয়ে কিভাবে ২৩তলা হলো? এই অনুমোদনহীন পাঁচতলার বিষয়ে রাজউক কেনই-বা এতদিন চুপ ছিল? যথাযথ নিয়ম না মেনেও কিভাবে রাজধানীর অভিজাত এলাকার বুকে ভবনটি দাঁড়িয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে একপ্রকার রহস্যজনক নীরবতাই পালন করা হলো।

এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়। বনানীর যে জায়গাটিতে এই টাওয়ারটি অবস্থিত সেই এলাকায় গা ঘেঁষে আরো কয়েকটি টাওয়ার রয়েছে। প্রত্যেকটি টাওয়ার এতটাই ঘিঞ্জি অবস্থায় যে একটিতে আগুন লাগলে সেই আগুন ছড়িয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। স্বভাবতই যে প্রশ্নটি জাগছে তা হলো— সেই এলাকার অন্য ভবনগুলো নির্মাণে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কিনা? সেই ভবনগুলোতে অনুমোদনহীন কোনো তলা রয়েছে কিনা? নাকি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার জন্য আমাদের আরেকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে?

জবাবদিহিতার পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ের ওপর নজর দেয়ার সময় এসেছে তা হচ্ছে—সক্ষমতা। অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবিলা করার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আমাদের রয়েছে কিনা? তবে এই সক্ষমতা সরকারি, বেসরকারি এমনকি ব্যক্তিপর্যায়েও বাড়াতে হবে। প্রত্যেককে তার নিজস্ব অবস্থান থেকে সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে আগুন দুর্ঘটনার ক্ষতি ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়— সব পর্যায়কেই সমভাবে ক্ষতিপ্রস্ত করে।

সরকারকে অবশ্যই ফায়ার সার্ভিসকে আধুনিকায়নে মনোযোগী হতে হবে। ফায়ার ফাইটারদের যথাযথ সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ফায়ার ফাইটারদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ না দিয়ে তাদের কাছে উচ্চাশা করা হবে অনেকটা হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে বলার মতো। ফায়ার সার্ভিস যত বেশি আধুনিকায়ন হবে, আগুন দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তত কম হবে। তাই সম্পদ রক্ষা এবং মূল্যবান প্রাণ রক্ষার স্বার্থে ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়ন অপরিহার্য।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সঙ্গে সঙ্গে সচেতনতা বেসরকারি এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে সমভাবে জরুরি। অবশ্যই যে কোনো প্রতিষ্ঠান যে কোনো স্থাপনা ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে আগুন দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সেই স্থাপনাটির আছে কিনা সেই বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাড়ি ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করা উচিত।

মনে রাখতে হবে যখন ভবন মালিকেরা ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে এই ধরনের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে তখন তারা নিজেদের স্বার্থেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবেন। যখন স্থাপনাতে আগুন দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকবে, তখন আগুন দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে। সবশেষে বলতে চাই, সময় এখন অসহায়ত্ব প্রকাশের নয়, বরং সময় এখন সক্ষমতা বৃদ্ধির, সময় এখন রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যথাযথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা না হলে অগ্নিদুর্ঘটনা নামক ফ্রাংকেনস্টাইন কেড়ে নেবে আরো বহু তাজা প্রাণ, নিভে যাবে আরো অনেক প্রজ্বলিত আশার প্রদীপ।

n লেখক:শিক্ষাবিদ