দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির গতিপথ ও চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫৮

মোস্তফা মোরশেদ

২০১৮ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের বিষয়টি খানিকটা পুরনো হয়ে গেলেও বোধ করি এর প্রাসঙ্গিকতা আগামীর অর্থনীতি বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। আমার দৃষ্টিতে ১৯৬৯ সাল থেকে শুরু হওয়া অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সময়োপযোগী স্বীকৃতিটি এসেছে গত বছর যেখানে মূল আলোচ্য ছিল ‘পিওর’ সামষ্টিক অর্থনীতি। দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিভাবে প্রকৃতি ও জ্ঞাননির্ভর সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর নির্ভরশীল সে বিষয় দুটি ডাব্লিউ ডি নরডাউস ও পল রোমারের গবেষণাকর্মে দারুণভাবে উঠে এসেছে। দীর্ঘ মেয়াদে একটা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কেমন হবে— তা সত্যিকার অর্থেই একটি গবেষণার বিষয়। ২০১৮ সালের নোবেল-জয়ীরা যে জায়গায় আগ্রহ তৈরি করেছেন তা হলো প্রবৃদ্ধি ও বাজারব্যবস্থার পরস্পরবিরোধী অবস্থান। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এ দ্বন্দ্ব অর্থনীতির পাঠকদের একধরনের আনন্দ দান করছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডাব্লিউ ডি নরডাউস বলেছেন, যদি বাজার তার আপন গতিতে চলে, তাহলে কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যাবে; সুতরাং বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অপরদিকে নরডাউসের সঙ্গে নোবেল পুরস্কার ভাগাভাগি করা পল রোমার বলেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ করলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কমে আসবে।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে সমসাময়িক অর্থনীতিবিদদের আগ্রহের শেষ নেই। প্রবৃদ্ধি কেন গুরুত্বপূর্ণ এটা অন্য আলোচনার বিষয়। প্রবৃদ্ধি মানে কি শুধু ফ্যাক্টরিতে উত্পাদনের উপকরণ দিয়ে দ্রব্য ও সেবা উত্পাদন? এরকম হলে প্রবৃদ্ধি কখনোই টেকসই হবে না। তাই সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো, প্রবৃদ্ধিকে কিভাবে টেকসই ও সহনীয় মাত্রার কার্বন নিঃসরণের সঙ্গে মানানসই করা যায়। বর্তমানে পুঁজিবাদী ধারার অর্থনৈতিক দর্শন বিবেচনায় প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়েই অর্থনীতির গতিপথ ঠিক করে নেওয়া হচ্ছে। প্রবৃদ্ধি কিভাবে হবে সেটা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। খুব সংক্ষিপ্ত আকারে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। নিকোলাস কালডর (১৯৫৭) এ বিষয়ে ছয়টি স্বতঃসিদ্ধ (stylized fact) প্রসঙ্গের অবতারণা করেছিলেন। একথা অনস্বীকার্য যে, প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রক্রিয়া একেক দেশের জন্য একেক রকম। তবে গবেষকরা একমত হয়েছেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং এর ক্রমাগত উত্কর্ষ সাধন ব্যতিরেকে দীর্ঘমেয়াদে একটা দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব; যে কারণে আফ্রিকা এখনও পিছিয়ে রয়েছে, আর পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কি গ্রোথ মডেলের মধ্যেই বিবেচিত হবে, নাকি মডেলের বাইরে থেকে নির্ধারিত হবে— এ নিয়ে নোবেল বিজয়ীদের দ্বিমত রয়েছে। ১৯৮৭ সালে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবার্ট সলো থেকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে রোমার বলেছেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন গ্রোথ মডেলের মধ্যেই নির্ধারিত হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, একটা দেশের প্রবৃদ্ধি নির্ভর করছে মোট ক্যাপিটাল স্টক-এর উপর। এটা মোটামুটি স্বীকৃত যে, ভৌত মূলধন প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে— যা পুরো প্রক্রিয়ার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যাখ্যা করতে পারে। তাছাড়া উত্পাদন উপকরণের ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উত্পাদন বিধিতো রয়েছেই। গবেষকরা এভাবে বলে থাকেন, প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নির্ভর করছে Total Factor Productivity-এর উপর। সে প্রেক্ষাপটে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রযুক্তিগত উত্কর্ষসাধন মডেলের মধ্য থেকে নির্ণয় হওয়াই স্বাভাবিক। এখন জানতে হবে প্রযুক্তির পরিবর্তন কিভাবে হবে? এটা এখন সর্বজনস্বীকৃত যে, এটা নির্ভর করছে নব উদ্ভাবন, গবেষণা এবং নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার উপর। এখানে আরো একটা বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, পৃথিবীর অনেক দেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে উচ্চ আয়ের দেশে যাবার পথে মধ্যম আয়ের ফাঁদে পতিত হয়েছে। ইতিহাস বলছে, মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়ানোর একমাত্র কৌশল হচ্ছে গবেষণার উপর জোর দেওয়া ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। যেহেতু উত্পাদন উপকরণের মধ্যে শ্রমিকই প্রযুক্তির পরিবর্তনকে এগিয়ে নিবে তাই পল রোমার প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে গ্রোথ মডেলের মধ্যে বিবেচনার জন্য বলেছেন। তাই একে মডেলের মধ্য থেকেই ঠিক করে নিতে হবে যা অন্তর্জনিষ্ণু (Endogenous) মডেল নামে বিবেচিত। সমালোচকরা বলছেন, এরকম ক্ষেত্রে জনসংখ্যা বেশি হলে প্রযুক্তির প্রসারের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য প্রাসঙ্গিক ধারণা (idea) সৃষ্টি করার পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক উদ্দীপক থাকতে হবে। বাজার যত প্রসারিত হবে, তত নতুন ধারণা সৃষ্টি হবে। বাজার স্বতন্ত্রভাবে এ কাজটি করে থাকে। ধ্রুপদী ধারার অর্থনীতিবিদগণও বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির কথা বলেছেন।

অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন পরস্পরবিরোধী আচরণ করে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ডাব্লিউ ডি নরডাউস যিনি পল রোমারের সঙ্গে যুগ্মভাবে ৯ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা ভাগাভাগি করবেন, তিনি তার গবেষণার ফলাফলে দেখিয়েছেন যে, কার্বন নিঃসরণ ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। নরডাউস তার ডাইনামিক ইন্টিগ্রেটেড ক্লাইমেট ইকোনমি (DICE) মডেল দিয়ে বলেছেন, কার্বন ট্যাক্স আরোপ করতে হবে। তিনি ১৯৭০ দশকে প্রথম দূষণের বিষয়টি বিবেচনা করেন এবং পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও অর্থনীতির সমন্বয়ে ডাইস মডেল তৈরি করেন। বস্তুত পৃথিবী একটি পদার্থ এবং এটি অসীম সময়ের জন্য অপরিমিত সম্পদের জোগান দিতে পারবে না। ধনী দেশগুলোর অপরিকল্পিত ও মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ২০১৫ থেকে প্রতি বছরই তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার রেকর্ড করে যাচ্ছে। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে জাতিসংঘ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে রাখার জন্য সতর্ক করেছে; যদিও ২০১৫ সালের প্যারিস অ্যাকর্ডে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বৈশ্বিক উষ্ণতা ক্রমশ কেন বেড়ে যাচ্ছে? এর কারণ মূলত দুটি: এক) কার্বন নিঃসরণের বাহ্যত সুযোগ ব্যয় (opportunity cost) শূন্য। দুই) বড় বড় দেশগুলো কার্বন নিঃসরণের বিষয়টি অগ্রাহ্য করছে। নরডাউসের গবেষণায় এর সমাধান উঠে এসেছে। প্রথম যে ডাইস মডেল তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে কার্বন ট্যাক্স আরোপের কথা বলা ছিল। প্রতি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য নরডাউস ৫ ডলার ট্যাক্স আরোপের কথা বলেছিলেন যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে। সেই হিসাবে ২০৮৫ সালে তা ২০ ডলারে উন্নীত হতে পারে। যদিও তাঁর ২০১৫ সালের গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত মেনে নিলে প্রতি টনে ১০৭-১৮৪ ডলার কার্বন ট্যাক্স দিতে হবে। ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়া প্রথম দেশ হিসেবে কার্বন ট্যাক্সের বিধান আরোপ করলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যারা কার্বন নিঃসরণের জন্য বহুলাংশে দায়ী তাদের এ বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই।

প্রবৃদ্ধি বাড়লে কার্বন নিঃসরণ বাড়বে, এটাই বাস্তবতা। আর প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বাজারকে স্বাধীন করে দিতে হবে। এখানেই ঘটেছে বৈপরীত্য। যদি কার্বনের ব্যবহার সীমিত করে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই, তবে বাজারকে অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আবার বাজার বেশি নিয়ন্ত্রণ করলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য যে আগ্রহ থাকা দরকার সেটি কমে যেতে পারে; ফলে উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হবে। একটি সুখী, সুন্দর বিশ্ব গঠনের জন্য প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতেই হবে। এ জন্য জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে সমন্বয় করে একটি যুগপত্ ক্ষেত্র তৈরি করতে পারাই হলো চ্যালেঞ্জ।

n লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক