জ্যাষ্টিন গোমেজ
প্রতিটি জাতি সভ্যতা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে খুঁজে পায় তার নিজস্ব অনুভূতি এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। আর ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মানুষ কিছু আনন্দ এবং স্মৃতিকে আপন করে নেয়। আর এ আপন করে নেওয়ার বিভিন্ন স্তর এবং সময়ের পথ ধরেই মূলত সংস্কৃতির বিকাশ। বাংলাদেশি ও বাঙালি জাতি হিসেবে, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আমাদের এমন একটি উত্সব হলো পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ হলো বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। বাঙালির সার্বজনীন ও প্রাণের উত্সব বাংলা নববর্ষ। অর্থাত্ পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কথায় আছে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ। আমাদের দেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবাই একে অপরের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মিলে-মিশে আনন্দ ভাগাভাগি করে। যেটি নিয়ে বাঙালিদের বিশ্বের দরবারে অহংকার করার মতো।
এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সার্বজনীন উত্সবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ঋতুধর্মী উত্সব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাত্পর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ প্রযুক্তির প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো। তখন প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকতো। এর পরেরদিন অর্থাত্ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উত্সবের আয়োজন করা হতো। এই উত্সবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে।
খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে, তত্কালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজিসৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। ‘পহেলা বৈশাখ’ বাংলাদেশের জাতীয় পার্বন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার ২১ ফেব্রুয়ারির মতোই থামিয়ে দিতে চেয়েছে বৈশাখের উদযাপন। পাকিস্তান সরকারের এই অন্যায় আচরণের জবাব দিতেই “ছায়ানট” ১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল (১লা বৈশাখ, বাংলা ১৩৭২ সন) রমনার বটমূলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এসো হে বৈশাখ এসো এসো গানটি দিয়ে সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করে। বস্তুত এই দিনটি থেকেই পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম এক পরিচায়ক রূপ ধারণ করে।
বৈশাখ হলো গ্রামগঞ্জ থেকে শহর-বন্দর পর্যন্ত বাঙালি নারী-পুরুষ-শিশু, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে জাতীয়ভাবে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠার দিন। আবহমানকাল থেকে এ অঞ্চলের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী নিজেদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে আসছে।
এখন নববর্ষ নতুন বছরের একটি সার্বজনীন উত্সবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। শুধু ইউরোপেই নয় আজকাল আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, মোটকথা যেখানেই বাঙালি সম্প্রদায় আছে সেখানেই উদ্যাপিত হয় পহেলা বৈশাখ। দেশ থেকে সেসব মেলার আয়োজকরা কিনে নিয়ে যান রকমারি পোশাক-আশাক আর ঐতিহ্যবাহী খাবার। বিদেশের মাটিতে দেশি উত্সবে সেখানেও জমে ওঠে বাঙালির এক অনাবিল মিলনমেলা। অতীতের তুলনায় বর্তমানে বর্ষবরণ পালনে নান্দনিকতাই বেশি। এটি এখন বাঙালিদের জাতীয় উত্সবে পরিণত হয়েছে।
সমস্ত হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, তিরোহিত হয়ে এ দেশে সত্যিকার অর্থেই ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়ে পরিণত হোক। গত দিনের দুঃখ, ক্লেশ ও ব্যর্থতার গ্লানির কালো মেঘ সরিয়ে সাফল্যের নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হোক চারদিক। সংস্কার মতাদর্শের মতো সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রম করে সব মানুষের হূদয়াবেগ থেকে উত্সারিত এক অতুলনীয় মহোত্সবে পরিণত হোক পহেলা বৈশাখ, এই কামনা। স্বাগতম, সুস্বাগতম বাংলা নববর্ষ।
n লেখক : শিক্ষার্থী, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা
