অনেক গুণ যার

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৭, ১০:৫৯
 
জন্ম তার ১৩৫০ সালে। নাম নিরঞ্জন ভৌমিক। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় সকলেই ডাকেন টুক্কু দা নামে। শরতের আকাশে যখন সাদা মেঘ আর মুহুর্মুহু হাওয়া তখন তাকে দেখা যায় আটানি জমিদার বাড়ির নির্জন রাস্তা দিয়ে একলা হাঁটছে। কাশবনের মতো তার সাদা চুলে যখন হাওয়া খেলে তখন ভিতরে খেলে অন্যকিছু। আশপাশের মানুষজন তার এই উদ্দেশ্যহীন হাঁটা দীর্ঘদিন ধরেই দেখে। দেখতে দেখতে তাদের চোখ সয়ে হয়ে যায়।
 
আবার বর্ষাকালে আকাশ যখন কৃষ্ণবর্ণ আর টানা বর্ষণ তখন তাকে দেখা যায় কীর্তনের মাঠের মন্দিরের সিঁড়িতে একলা বসে থাকতে। তখন তার হাতে তার প্রিয় বেহালাটা দেখা যায়। বেহালাটা তার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। বাবার কাছেই বেহালার হাতেখড়ি। বাবা নৃপেন্দ্র ভৌমিক ছিলেন, মুক্তাগাছার জমিদার বাড়ির সংগীত শিক্ষক। জমিদার তয়নাদের পদাবলী কীর্তন শিখাতেন আবার উৎসব, পার্বণে বেহালায় সুর তুলতেন। 
 
জমিদার বাড়িতে ছিল ভূকেন্দ্র রঙ্গপীঠ। ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চ। সেই নাট্যমঞ্চে জমিদারদের সাথে নাটকের পাঠ গাইতেন তার বাবা আবার নাটকে সংগীত পরিচালনাও করতেন। বাবার হাত ধরে শৈশবে জমিদার বাড়িতে যাওয়ার স্মৃতি কুয়াশার মতো ঝাপসা ঝাপসা মনে পড়ে তার। মনে পড়ে মণ্ডা খাওয়ার আনন্দের স্মৃতি। বাবা মারা যাওয়ার পর বাবার স্পর্শ মাখা, ইতিহাস হয়ে থাকা বেহালাটা হাতে তুলে নেন তিনি। সময়টা ১৯৭০। মুক্তিযুদ্ধে সবকিছুর সাথে অনেক বাদ্যযন্ত্রও লুটপাট হয়ে যায় কিন্তু বেহালাটা হাতছাড়া করেন নি তিনি।
 
৩৫ বছর শহীদ স্মৃতি কলেজের লাইব্রেরিয়ান পদে থেকে ২০০৬ সালে অবসর নেন তিনি। তিনি একজন খেলা পাগল মানুষও। যতটা না মাঠে খেলতে তার থেকে বেশি পছন্দ করেন মাঠের বাইরে থেকে মাইকে ধারাভাষ্য দিতে। বাংলা ও ইংরেজিতে খেলার ধারাভাষ্য দেন অনর্গল। রেডিওতে খেলা শুনতে শুনতে ধারাভাষ্যের শখটা জেগে ওঠে সেই স্কুল লাইফ থেকে।
 
দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে ঢাকায় চাকরি করেন। বাবাকে ঢাকায় নিয়ে যাবার চেষ্টা করে ছেলে। কিন্তু টুক্কু রাজি হননি। এই মুক্তাগাছার জল, বাতাস, দূর্বাঘাস, জমিদার বাড়ির রাস্তা, কীর্তনের মাঠ, কালীবাড়ি পুকুর ঘাট ছেড়ে তিনি কোথাও গিয়ে শান্তি পাবেন না। প্রাচীন এই শহরের সাথে সাথে তিনিও প্রাচীন হতে থাকেন।
 
কলেজের পাশ ঘেঁষে প্রাচীন জমিদার বাড়ি। কলেজ হলো টুক্কুর কর্মস্থল, জমিদার বাড়ি তার বাবার কর্মস্থল। আলোর অহমিকা এই রাস্তাটিকে গ্রাস করতে পারেনি এখনো। এখনো আধার তার রহস্যের ঝাঁপি খুলে দিতে পারে এখানে। ভগ্ন জমিদার বাড়ি হাজারো স্মৃতি নিয়ে দাড়িয়ে আছে মৌনব্রতে।টুক্কু সেইসব রাস্তা দিয়ে একলা হাঁটেন। মাঝেমাঝে ভগ্ন প্রাচীরে হাত বুলায়। হয়তো তার বাবার বেহালার সুর ধরার চেষ্টা করেন। যে সুরে টুক্কুর বাবা মুগ্ধ করেছিলো জমিদার জগৎকিশোর আচার্য চৌধুরীকে। তার মনে হয় ভগ্ন জমিদার বাড়ির দেয়ালে, শ্যওলায় সেই সুর হয়তো লেগে আছে। তিনি মনে প্রাণে একজন ভালো বেহালাবাদক হতে চেয়েছেন। টুক্কুর একমাত্র স্বপ্ন ছিল টিভিতে বেহালা বাজানো। সেই স্বপ্ন তার পূরণ হয়েছে।
 
নিজের হাতে লাগানো একটি গাছ অনেক বড় হয়েছে কলেজ প্রাঙ্গণে। কখনো কখনো হাঁটতে হাঁটতে কলেজে আসেন। বিকেলটা বসে থাকেন মাঠে। বিকেলের বাতাস তার সাদা চুলে লাগে। জমিদার বাড়ির প্রাচীন রাস্তায় আবারো তিনি একা হয়ে যান হাঁটতে হাঁটতে। রাগ বাগেশ্রী ও মালকোষ তার বুকের ভিতর বাজতে থাকে নিরন্তর। আশপাশের মানুষজনের মনে হয়, তিনি উদ্দেশ্যহীন হাঁটেন এবং দেখতে দেখতে তা তাদের চোখ সওয়া হয়ে যায়। মনে হয়, এরকম উদ্দেশ্যহীন হাঁটার মানুষ আশপাশ থেকে কমে যাচ্ছে ক্রমেই।
 
ইত্তেফাক/জামান